যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিন মাস পেরোতেই ওভাল অফিসে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ একটি নাটকীয় ও বিতর্কিত মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিবিসির সাংবাদিক গ্যারি ও’ডনোঘের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে বুধবার (২১ মে ২০২৫) ঘটে যাওয়া ঘটনা ট্রাম্পের এই কৌশলের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই সাক্ষাতে ট্রাম্প আলো নিভিয়ে, ভিডিও প্রদর্শন করে এবং সন্দেহজনক সংবাদ কাটিংয়ের মাধ্যমে রামাফোসাকে একপ্রকার ‘অ্যাম্বুশ’ করেন, যা ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তির মতো।
টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে সংযত আলোচনার মধ্যে এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে দক্ষিণ আফ্রিকায় তথাকথিত ‘শ্বেত গণহত্যা’ নিয়ে প্রশ্ন করলে রামাফোসা বলেন, এ বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকানদের কণ্ঠ শোনা প্রয়োজন। ট্রাম্প তখন তার সহকারীকে নির্দেশ দেন আলো নিভিয়ে টিভিতে ভিডিও চালাতে, যাতে তিনি রামাফোসাকে “কয়েকটা জিনিস” দেখাতে পারেন। ভিডিওতে দেখানো হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু রাজনৈতিক নেতার ‘শুট দ্য বুর’ গান, যা বর্ণবাদ বিরোধী একটি গান হলেও ট্রাম্প এটিকে শ্বেত নাগরিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি সন্দেহজনক উৎসের ছবি ও প্রতিবেদন প্রদর্শন করেন এবং ‘শ্বেত কৃষকদের কবর’ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শুধু বলেন, “সাউথ আফ্রিকা।”
ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ধনকুবের ইলন মাস্ক এই সময় নীরবে সোফার পেছনে বসে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। রামাফোসা অবশ্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণ বিলের বিষয়ে স্পষ্ট করেন যে, এটি এখনো কার্যকর হয়নি এবং ভিডিওতে দেখানো নেতারা সরকারের অংশ নন। তিনি শান্ত ও সংযত থেকে ট্রাম্পের উস্কানি এড়িয়ে যান।
রামাফোসা ট্রাম্পের গলফপ্রীতির কথা মাথায় রেখে দুই শীর্ষ গলফার, আর্নি এলস ও রেটিফ গুসেন, এবং কৃষিমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। এই কূটনৈতিক ‘গোল্ডেন ডোম’ ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণ করে। গলফাররা ও কৃষিমন্ত্রী শ্বেত কৃষকদের অবস্থা নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন, যা রামাফোসার সংযত বক্তব্যের সমান সময় পায়। রামাফোসা বলেন, “যদি আফ্রিকান কৃষকদের গণহত্যা চলত, তাহলে এই তিনজন ভদ্রলোক আজ এখানে থাকতেন না।” এই যুক্তি দিয়ে তিনি ট্রাম্পের অভিযোগ খণ্ডন করেন।
ট্রাম্পের এই নাটকীয় কূটনীতি শুধু বিদেশি নেতাদের জন্য নয়, মার্কিন জনগণের জন্যও। তিনি তার সমর্থকদের মধ্যে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের ক্ষোভ ও অভিমান জিইয়ে রাখতে চান। দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘শ্বেত গণহত্যা’র অভিযোগ তুলে তিনি তার সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় কিছু বিতর্কিত ধারণাকে উসকে দেন, যা মূলত ডানপন্থী ও শ্বেত জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত।
প্যাট্রিক গ্যাসপার্ড, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত, এই ঘটনাকে “শোচনীয় প্রদর্শন” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “ট্রাম্পের শর্তে কথা বলা কারো জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না।” ব্রিটিশ বিশ্লেষক টিম মার্শালবলেন, এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে জেলেনস্কির সঙ্গে ঘটনাটিও হোয়াইট হাউসের পরিকল্পিত ছিল।
ট্রাম্পের ওভাল অফিস এখন বিদেশি নেতাদের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে তারা প্রকাশ্য অপমানের শিকার হতে পারেন। রামাফোসা তার শান্ত ও কৌশলগত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে এই ‘অ্যাম্বুশ’ সামাল দিয়েছেন, তবে এটি অন্য নেতাদের জন্য সতর্কবার্তা। ট্রাম্পের এই কৌশল তার সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করলেও, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি করতে পারে, যা চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিদেশি নেতারা যদি এই পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে শিখে যান, তবে ট্রাম্পকেও তার কৌশল পরিবর্তন করতে হতে পারে।













































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































