বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ এমপি রুশনারা আলী তার মালিকানাধীন পূর্ব লন্ডনের একটি টাউনহাউস থেকে চারজন ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করে মাসিক ভাড়া ৭০০ পাউন্ড বাড়ানোর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এই ঘটনা তাকে গৃহহীনবিষয়ক মন্ত্রীর (হোমলেসনেস মিনিস্টার) পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। তিনি গত বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট ২০২৫) পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে, কারণ রুশনারা আলী গৃহায়ণ, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
রুশনারা আলী পূর্ব লন্ডনের বো এলাকায় অবস্থিত একটি চার বেডরুমের টাউনহাউসের মালিক, যেটি তিনি ২০১৪ সালে ৫৭০,০০০ পাউন্ডে ক্রয় করেন। এই বাড়িটি ২০২৪ সালের মার্চ থেকে চারজন তরুণ পেশাদার ভাড়াটিয়া মাসিক ৩,৩০০ পাউন্ডে ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিলেন। গত নভেম্বরে তাদের চার মাসের নোটিশ দিয়ে জানানো হয় যে, তাদের নির্ধারিত মেয়াদি চুক্তি নবায়ন করা হবে না এবং তাদের বাড়ি ছাড়তে হবে। বাড়িটি বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু বিক্রি না হওয়ায় এটি পুনরায় ভাড়ার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়, এবার মাসিক ৪,০০০ পাউন্ডে, অর্থাৎ ৭০০ পাউন্ড বেশি ভাড়ায়।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর রুশনারা আলীর বিরুদ্ধে ‘গেটেড কমিউনিটি’র নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। বো কোয়ার্টারের বাসিন্দারা দাবি করেছেন, আলীর বাড়িটি একাধিক দখলকৃত সম্পত্তি (Houses in Multiple Occupancy বা HMO) হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত, কারণ চারজন ভাড়াটিয়া একসঙ্গে টয়লেট, বাথরুম ও রান্নাঘরের সুবিধা ভাগ করে নিয়ে বসবাস করছিলেন। এই ধরনের সম্পত্তির জন্য বিশেষ লাইসেন্স প্রয়োজন, যা নিয়ে বাসিন্দারা পূর্বে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: চাপের মুখে পদত্যাগ করলেন টিউলিপ সিদ্দিক
রুশনারা আলী গৃহহীনবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বারবার ভাড়াটিয়াদের অধিকার রক্ষার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ‘রেন্টার্স রাইটস বিল’-এর সমর্থক ছিলেন, যেটি ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদের পর ছয় মাসের মধ্যে সম্পত্তি বেশি ভাড়ায় পুনরায় তালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে ‘নো-ফল্ট উচ্ছেদ’ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা গৃহহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। তার এই পদক্ষেপের বিপরীতে নিজের সম্পত্তিতে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ ও ভাড়া বৃদ্ধির ঘটনা তাকে ‘চরম ভণ্ডামি’র অভিযোগের মুখে ফেলে।
টোরি নেতা কেমি বাডেনক এই ঘটনাকে ‘চরম ভণ্ডামি’ বলে সমালোচনা করে বলেন, “গৃহহীনবিষয়ক মন্ত্রী নিজেই মানুষকে গৃহহীন করছেন।” কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান কেভিন হলিনরেক বলেন, “এটি লেবার সরকারের দ্বৈত মানদণ্ড ও স্বার্থপরতার প্রমাণ।” লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের একজন মুখপাত্রও আলীর পদক্ষেপকে ‘চরম দায়িত্বহীন’ বলে সমালোচনা করেছেন।
আরও পড়ুন: সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠালো ডব্লিউএইচও
একজন প্রাক্তন ভাড়াটিয়া, লরা জ্যাকসন (৩৩), যিনি একজন রেস্তোরাঁর মালিক, বলেন, “এত বেশি ভাড়া বাড়ানো শোষণের সামিল। এমপিদের নিজ এলাকায় বাড়িওয়ালা হওয়া নৈতিকভাবে ভুল এবং এটি স্বার্থের সংঘাত।”
রুশনারা আলী তার পদত্যাগপত্রে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে লেখেন, “আমি সব সময় আইনি প্রয়োজনীয়তা মেনে চলেছি এবং আমার দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেছি। তবে আমার পদে থাকা সরকারের উচ্চাভিলাষী কাজের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমি পদত্যাগ করছি।” তিনি আরও বলেন, তিনি লেবার সরকারের প্রতি তার সমর্থন অব্যাহত রাখবেন এবং বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড স্টেপনি’র সংসদ সদস্য হিসেবে নিজ নির্বাচনী এলাকার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন।
রুশনারা আলী ২০১০ সাল থেকে বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড স্টেপনি’র এমপি। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ১,৬৮৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন, যা তার আগের নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম। এই বিতর্ক তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, বিশেষ করে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়োর পার্টি’র মতো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছ থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে।

















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































