'মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠলে ইউরেনিয়াম মজুত কমাতে প্রস্তুত ইরান'

দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে নতুন এক কূটনৈতিক মোড় নিল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। তেহরান জানিয়েছে, ওয়াশিংটন যদি ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে, তবে তারা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত কমিয়ে আনার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত।

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি এই ইঙ্গিত দেন।

আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা, তবে ‘জিরো এনরিচমেন্ট’ নয়

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় দফার আলোচনার আগে ইরান তাদের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। বিবিসির সাথে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আন্তরিকতা দেখা যায়, তবে ইরান তাদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত কমিয়ে বা মিশ্রিত করে এর ঘনত্ব কমিয়ে আনতে (Dilute) রাজি। তবে তিনি এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ বা ‘জিরো এনরিচমেন্ট’-এর মতো কোনো দাবি তেহরান মেনে নেবে না।

মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি বলেন, “বল এখন আমেরিকার কোর্টে। তারা যদি সত্যিই একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই আমাদের অর্থনীতির ওপর চেপে বসা নিষেধাজ্ঞাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। আমরা নমনীয় হতে প্রস্তুত, কিন্তু সেটা হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।”

প্রেক্ষাপট ও বর্তমান উত্তেজনা

২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বর্তমানে ইরান প্রায় ৪০০ কেজির বেশি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে বলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ধারণা করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই স্তর থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধিতে পৌঁছানো কেবল সময়ের ব্যাপার।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাসকাটে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে উভয় পক্ষই। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রশাসনের ‘মিলিটারি স্ট্রাইক’ বা সামরিক হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি এই আলোচনাকে এক জটিল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আলোচনার প্রধান শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে কেবল পরমাণু কর্মসূচি। তবে ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্র ইসরায়েল চাইছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিকেও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করতে। এ প্রসঙ্গে রাভাঞ্চি দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে কোনো আপস হবে না। যখন আমরা আক্রান্ত হই, তখন এই মিসাইলগুলোই আমাদের রক্ষা করে।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জেনেভার এই বৈঠকটি হতে যাচ্ছে বাইডেন বা ট্রাম্প পরবর্তী মার্কিন বিদেশনীতির এক বিশাল পরীক্ষা। ইরান যদি সত্যি তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কমিয়ে ২০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনে, তবে সেটি হবে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয়। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঝুঁকি নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *