ভারত জম্মু অঞ্চলের বাগলিহার এবং সালাল পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে চেনাব নদীর পানি প্রবাহ রোববার (৪ মে) থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছে, যার ফলে নদীর পানির স্তর এতটাই কমে গেছে যে ভাটির এলাকার বাসিন্দারা পায়ে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এমন দৃশ্য এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এই পদক্ষেপ এসেছে ভারত সরকারের ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি (Indus Waters Treaty) পাকিস্তানের সঙ্গে স্থগিত করার সিদ্ধান্তের পর। এই সিদ্ধান্ত ২২ এপ্রিল পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর নেওয়া হয়েছে, যে হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাগলিহার বাঁধের পাঁচটি প্রধান গেট এবং সালাল বাঁধের গেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চেনাব নদীর পানির প্রবাহ পাকিস্তানের দিকে ৯০% পর্যন্ত কমে গেছে। সাধারণত ২৫-৩০ ফুট গভীরতার নদীটির পানির স্তর এখন মাত্র ১.৫-২ ফুটে নেমে এসেছে, যা জম্মুর আখনুর এলাকায় বাসিন্দাদের জন্য অভূতপূর্ব। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “প্রথমবারের মতো আমি চেনাব নদীর অর্ধেকটা হেঁটে পার হয়েছি। এটা অবিশ্বাস্য।”
সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বাঁধের গেট বন্ধের কারণ হলো পলি পরিষ্কার করা এবং জলাধার পুনরায় পূর্ণ করার নিয়মিত প্রক্রিয়া। তবে, এই পদক্ষেপকে অনেকে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করছেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চেনাবের মতো পশ্চিমী নদীগুলোর পানি প্রবাহে পরিবর্তনের আগে পাকিস্তানকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল ভারতের, যা এবার পালন করা হয়নি।
জম্মুর আখনুর এলাকার বাসিন্দারা এই পদক্ষেপকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছেন। বিনয় গুপ্ত নামে একজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা চাই না পাকিস্তানে এক ফোঁটাও পানি যাক। আমরা ভারতীয় সেনা ও প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে আছি।” আরেক বাসিন্দা কমল লাঙ্গার বলেন, “আমাদের সরকার পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দিচ্ছে।” জাতিসংঘের সাবেক সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা লভ পুরি মনে করেন, চুক্তি স্থগিত করা এবং পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। তিনি বলেন, “এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ভারত এখন পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো ও সামর্থ্য অর্জন করেছে।”
এদিকে, জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহ চুক্তির বিরোধিতা করে বলেছেন, এটি জম্মু ও কাশ্মীরের স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চেনাবের পানি জম্মুতে এবং ঝেলমের পানি কাশ্মীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা উচিত। “আমরা বহুদিন ধরে বলছি, এই চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।”
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার পানি ভাগাভাগি নিয়ন্ত্রণ করে। চুক্তি অনুযায়ী, পূর্ব নদীগুলো (রাভি, বিপাশা, সতলুজ) ভারতের নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিম নদীগুলো (সিন্ধু, ঝেলম, চেনাব) পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পশ্চিম নদীগুলোর পানি পাকিস্তানের কৃষির ৮০% এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চেনাব নদী পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি প্রধান পানির উৎস। বাগলিহার এবং সালাল বাঁধ থেকে পানি প্রবাহ সীমিত হওয়ায় পাকিস্তানের কৃষি ও পানীয় জলের সরবরাহে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। পাকিস্তানের কৃষকরা ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কেউ কেউ বলছেন, “যদি পানি বন্ধ হয়, তবে এটি আমাদের জন্য মরুভূমির মতো হয়ে যাবে। আমরা ক্ষুধায় মারা যাব।” পাকিস্তান সরকার এই পদক্ষেপকে “যুদ্ধের কাজ” হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বর্তমান অবকাঠামো তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিম নদীগুলোর পানি সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য পর্যাপ্ত নয়, কারণ বাগলিহার এবং সালালের মতো প্রকল্পগুলো “রান-অফ-দ্য-রিভার” ধরনের, যেগুলোতে সীমিত জলাধার ক্ষমতা রয়েছে। তবে, চুক্তি স্থগিতের ফলে ভারত এখন নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ ত্বরান্বিত করতে পারে। চেনাব নদী ও এর উপনদীতে পাকাল দুল (১০০০ মেগাওয়াট), রাতলে (৮৫০ মেগাওয়াট), কিরু (৬২৪ মেগাওয়াট) এবং সাওয়ালকোট (১৮৫৬ মেগাওয়াট) প্রকল্পগুলো ইতিমধ্যে কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে পশ্চিম নদীগুলোর পানি ভারতের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে।
পাকিস্তান এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে এবং বিশ্বব্যাংক, হেগের স্থায়ী আরবিট্রেশন আদালত এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, “সিন্ধু আমাদের, এবং সিন্ধু আমাদেরই থাকবে, এতে পানি প্রবাহিত হোক বা তাদের রক্ত।” পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, পানি প্রবাহ বন্ধ বা সরানোর যেকোনো প্রচেষ্টাকে “যুদ্ধের কাজ” হিসেবে গণ্য করা হবে এবং “জাতীয় শক্তির পূর্ণ বর্ণালী” দিয়ে এর জবাব দেওয়া হবে।
এই ঘটনা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সংকটের প্রেক্ষাপটে আরও জটিলতা যোগ করবে। ভারতের একতরফা পদক্ষেপ বাংলাদেশ এবং নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে, যারা ভারতের সঙ্গে পানি ভাগাভাগির বিষয়ে সংবেদনশীল।
চেনাব নদীর পানি প্রবাহ সীমিত করা এবং সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করা ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপের অংশ। এটি পাকিস্তানের কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে, যখন ভারত নিজের জল সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে, এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তানের হুমকি এবং আইনি পদক্ষেপের মুখে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এই সংকট সমাধানে কূটনৈতিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার গুরুত্ব অপরিসীম।

















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































