ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে স্থল যোগাযোগের একমাত্র পথ। এই ২০-২২ কিলোমিটার প্রশস্ত করিডোরটি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং চীনের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা এটিকে ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সম্প্রতি ভারত এই অঞ্চলে নজিরবিহীন সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান এবং রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন। এই পদক্ষেপগুলো ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চীন ও বাংলাদেশের সম্ভাব্য হুমকির প্রতি একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু। এটি হাতছাড়া হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে স্থল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এই কারণে ভারত বাগডোগরা ও হাশিমারায় দুটি বিমানঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সম্প্রতি হাশিমারায় রাফাল স্কোয়াড্রন এবং এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ সিস্টেম মোতায়েন করেছে। এস-৪০০ সিস্টেম ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশপথে হুমকি মোকাবেলায় সক্ষম, যা যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ধ্বংস করতে পারে। এই ব্যবস্থা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে পাকিস্তান ও চীনের সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে।
ভারত সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে মানববিহীন বিমান (UAV) চলাচল নিষিদ্ধ করেছে এবং পূর্ব সীমান্তে আকাশপথে নজরদারি বাড়িয়েছে। এছাড়া, ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি মাল্টি-জোন ডিটারেন্স ডকট্রিন তৈরি করছে, যার মধ্যে রয়েছে রিয়েল-টাইম আইএসআর (ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেইল্যান্স, রিকনেসান্স) ইন্টিগ্রেশন, সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ক্ষমতা, এবং ত্রি-সেবা সমন্বয়। শিলিগুড়ি করিডোরে দ্রুত সামরিক সমাবেশের জন্য রাস্তা, টানেল এবং রেল সংযোগ নির্মাণও গতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভারতের উদ্বেগ
বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতায় আসার পর দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। দ্য এশিয়া লাইভের মতে, বাংলাদেশ চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে ভারত উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি পাকিস্তানি একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে, যা ভারতের অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ৩২টি চীনা-পাকিস্তানি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা ভারতের উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। এই বিমানগুলো AESA রাডার, EW পড এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত, যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মোতায়েন হলে ভারতীয় বিমানঘাঁটি ও অবকাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত ভারসাম্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
চীনের সামরিক মহড়া এবং ভারতের প্রতিক্রিয়া
ভারত-ভুটান সীমান্তের কাছে চীনের সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চীন তিব্বতের চুম্বি উপত্যকায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে, যা শিলিগুড়ি থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার দূরে। ২০১৭ সালে ডোকলাম সীমান্তে চীন-ভারত উত্তেজনার পর ভারত এই অঞ্চলে সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছিল। চীনের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং ভুটানের পশ্চিম ও মধ্য সেক্টরে ভূমি দাবি ভারতের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধির জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারত এই অঞ্চলের ঘটনাবলী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেবে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভারত বাংলাদেশ ও চীনের কার্যক্রমকে সম্ভাব্য জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
শিলিগুড়ি করিডোরে ভারতের সামরিক মোতায়েন কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং এটি চীন ও বাংলাদেশের প্রতি একটি স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা। ভারত জানিয়ে দিয়েছে যে এই করিডোরটি কেবল একটি যোগাযোগ পথ নয়, বরং এটি একটি ‘লাল রেখা’। প্রক্সি জোট, গ্রে-জোন যুদ্ধ এবং প্রযুক্তি-চালিত সংঘাতের এই যুগে ভারত তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এই পরিস্থিতি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হলেও, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন যে সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে এই উত্তেজনা নিরসন করা উচিত।

















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































