১২ জুন ২০২৫-এ আহমেদাবাদের সরদার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট এআই ১৭১, একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ড পর বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে ২৪১ জন এবং মাটিতে ১৯ জনসহ মোট ২৬০ জনের মৃত্যু হয়। ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি) ৮ জুলাই একটি প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করে, যা নিয়ে এয়ারলাইন পাইলট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (আলপা) এবং বিশেষজ্ঞদের একাংশ তীব্র সমালোচনা করেছেন।
প্রাথমিক রিপোর্ট
এএআইবি’র প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, উড্ডয়নের তিন সেকেন্ড পর, ১৩:৩৮:৪২ IST-এ, এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি ১৮০ নট গতিতে পৌঁছানোর সময় উভয় ইঞ্জিনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ‘RUN’ থেকে ‘CUTOFF’ অবস্থানে চলে যায়, যার ফলে ইঞ্জিনগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি হারায়। ককপিট ভয়েস রেকর্ডারে একজন পাইলটকে অন্যজনকে জিজ্ঞাসা করতে শোনা যায়, “তুমি জ্বালানি বন্ধ করলে কেন?” উত্তরে অন্য পাইলট বলেন, “আমি তা করিনি।” এর ১০-১২ সেকেন্ড পর সুইচগুলো পুনরায় ‘RUN’ অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়, যার ফলে একটি ইঞ্জিন পুনরায় চালু হয়, কিন্তু দ্বিতীয় ইঞ্জিন পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। এ সময় র্যাম এয়ার টারবাইন (RAT) স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোতায়েন হয়, যা দ্বৈত ইঞ্জিন ব্যর্থতার সময় জরুরি শক্তি সরবরাহ করে। বিমানটি ৬২৫ ফুট উচ্চতায় পৌঁছানোর পর উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর অতিক্রম করার আগেই বিজে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে বিধ্বস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা
ভারতীয় বিমান বাহিনীর সাবেক পরিচালক এবং বিমান বিশেষজ্ঞ সঞ্জীব কাপুর ইন্ডিয়া টুডের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রিপোর্টটির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “মে ডে কল কোনো পাইলট হালকাভাবে করেন না। এটি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। রিপোর্টে উভয় ইঞ্জিনের ব্যর্থতার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও, কীভাবে সুইচগুলো ‘CUTOFF’ অবস্থানে গেল, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কোনো সুস্থ পাইলট কেন উড্ডয়নের পরপরই ইচ্ছাকৃতভাবে জ্বালানি বন্ধ করবেন? এটি অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য।” কাপুর আরও উল্লেখ করেন, ককপিট ডেটা ২৫ জুন ডাউনলোড করা হলেও রিপোর্ট প্রকাশে ২০ দিন বিলম্ব হয়েছে, যা অযৌক্তিক। তিনি বলেন, “তদন্তকারীদের কাছে সমস্ত তথ্য থাকা সত্ত্বেও রিপোর্টে বিশদ তথ্যের অভাব রয়েছে।”
এয়ারলাইন পাইলট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (আলপা) রিপোর্টে পাইলটদের দিকে ইঙ্গিত করার প্রবণতার সমালোচনা করে বলেছে, এটি তদন্তের স্বচ্ছতার অভাব প্রকাশ করে। তারা জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচের নকশা এবং সম্ভাব্য ইলেকট্রনিক ত্রুটির উপর গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
রিপোর্টের অন্যান্য তথ্য
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮ সালে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) বোয়িং ৭৩৭-এর জ্বালানি সুইচের লকিং ফিচার নিয়ে একটি পরামর্শমূলক বুলেটিন জারি করেছিল, যা বোয়িং ৭৮৭-এর জন্যও প্রযোজ্য। এয়ার ইন্ডিয়া এই ঐচ্ছিক পরিদর্শন না করায় সম্ভাব্য ত্রুটি অজানা ছিল। বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ডে ২০২৩ সালের পর জ্বালানি সুইচ সংক্রান্ত কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি। ডান ইঞ্জিনটি ২০২৫ সালের মার্চে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল, এবং বাম ইঞ্জিনটি ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিষেবার জন্য প্রস্তুত ছিল। ক্যাপ্টেন সুমিত সবরওয়ালের ১৫,৬৩৮ ফ্লাইট ঘণ্টা এবং কো-পাইলট ক্লাইভ কুন্দরের ৩,৪০০ ফ্লাইট ঘণ্টার অভিজ্ঞতা ছিল। উভয়েই প্রি-ফ্লাইট মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়েছিলেন। RAT-এর মোতায়েন এবং অক্জিলিয়ারি পাওয়ার ইউনিট (APU)-এর স্বয়ংক্রিয় স্টার্ট-আপ দ্বৈত ইঞ্জিন ব্যর্থতার পর সঠিকভাবে কাজ করেছিল, তবে কম উচ্চতার কারণে বিমানটির দুর্ঘঘতনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: ভারতে ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানায় বিস্ফোরণ, ৩৬ জনের মৃত্যু
এআইবি, বোয়িং, জিই এরোস্পেস, এনটিএসবি (যুক্তরাষ্ট্র), এএআইবি (যুক্তরাজ্য), এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত চলছে। ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য ২৫ জুন ডাউনলোড করা হয়েছে, তবে পিছনের এনহ্যান্সড এয়ারবোর্ন ফ্লাইট রেকর্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত রিপোর্ট আগামী ১২ মাসের মধ্যে প্রকাশিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে













































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































