নতুন সরকারকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়ার প্রস্তাব ওয়াশিংটনের

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছে চীনা সামরিক সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটন। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন গতকাল এক সাক্ষাৎকারে এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তার কথা জানান।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন। ২০২৪ সালের আগস্টে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন।

গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয়ের ফলে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে বেইজিং কৌশলগতভাবে ঢাকার সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে, যা এখন ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওয়াশিংটনের নতুন সমীকরণ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সম্প্রসারণশীল পদচারণা যুক্তরাষ্ট্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতার ঝুঁকিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই। চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বিকল্প হিসেবে আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের মিত্র দেশগুলোর মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে চীনের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি বেইজিং বাংলাদেশে একটি ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের চুক্তি সই করেছে, যা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বিশেষ করে ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান থেকে যৌথভাবে নির্মিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি চীনের আধিপত্য রুখতে মরিয়া। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠন হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চায়। তবে চীনও হাত গুটিয়ে বসে নেই। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়েছে, তাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এতে কোনো হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।

সব মিলিয়ে, কালকের নির্বাচনের পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—এই দুই পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে চীনা নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিমা প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা বাংলাদেশের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি কৌশলগতভাবেও বেশ জটিল।

প্রতিবেদনের মূল বিষয়:

  • বিকল্প প্রস্তাব: চীনা সামরিক সরঞ্জামের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের (যেমন ন্যাটোভুক্ত দেশ) প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব।

  • নির্বাচনী প্রেক্ষাপট: ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ; আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর মধ্যে।

  • কূটনৈতিক চাপ: চীনের ড্রোন ফ্যাক্টরি এবং পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কেনার গুঞ্জনের মধ্যেই মার্কিন এই প্রস্তাব এল।

  • আঞ্চলিক ভারসাম্য: ওয়াশিংটন চায় ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক হোক, যাতে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *