ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা চরমে-পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ব্যাবহারের হুমকি

ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে গত মঙ্গলবার পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক চরমভাবে অবনতি হয়েছে। হামলায় ২৬ জন নিহত ও ১৭ জনের বেশি আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তুলেছে। ভারত একতরফাভাবে ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। জবাবে পাকিস্তান পানির প্রবাহ বন্ধকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচনা করে ‘প্রচলিত ও অপ্রচলিত’ (পরমাণু) শক্তি দিয়ে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। শুক্রবার পাকিস্তানি ইংরেজি সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এ তথ্য জানিয়েছে।

হামলা ও ভারতের প্রতিক্রিয়া

গত মঙ্গলবার পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) পর্যটকদের ওপর হামলা চালায়, যাকে ভারত পাকিস্তান-ভিত্তিক লস্কর-ই-তৈবার শাখা বলে দাবি করেছে। ভারত হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে দুই হামলাকারীকে পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর জেরে ভারতের ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (সিসিএস) বুধবার সিন্ধু পানিচুক্তি ‘স্থগিত’ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কমানো, সীমান্ত বন্ধ, এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।

ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তি ‘স্থগিত’ করা হয়েছে, ‘বাতিল’ নয়, যা ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাংকের সামনে কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে, চুক্তির আওতায় নদীগুলোর প্রবাহ-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ বন্ধ করলে পাকিস্তানে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বন্যা পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাকিস্তানের কঠোর প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এনএসসি) বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে পানিকে দেশের ‘লাইফলাইন’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, ২৪ কোটি মানুষের অস্তিত্ব এর ওপর নির্ভরশীল। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, “সিন্ধু পানিচুক্তি অনুযায়ী পানির প্রবাহ বন্ধ বা ভিন্ন দিকে সরানোকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর জবাবে জাতীয় শক্তির সম্পূর্ণ পরিসরে পূর্ণশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে।” পাকিস্তান ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ এবং ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা বাতিল করেছে।

পাকিস্তান জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না। দেশটির কৃষি ব্যবস্থার ৯০ শতাংশ সিন্ধু নদের পানির ওপর নির্ভরশীল, যা চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। এনএসসি জানায়, পানির প্রবাহ রক্ষা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

পরমাণু হুমকির আশঙ্কা

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ভারত যদি পানির প্রবাহ বন্ধ করতে জলাধার বা বাঁধ নির্মাণ করে, পাকিস্তান সেগুলো সামরিক শক্তি, এমনকি প্রয়োজনে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংস করতে পারে। একজন বিশ্লেষক বলেন, “পানি পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থের অংশ। এটি হরণ করা হলে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে পদক্ষেপ নেবে।” এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এনএসসির ‘সম্পূর্ণ জাতীয় শক্তি’ উল্লেখ পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

চুক্তির গুরুত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানিচুক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতার একটি বিরল উদাহরণ। পাকিস্তানের সাবেক সিন্ধু পানি কমিশনার জামাত আলী শাহ বলেন, “এই চুক্তি স্থায়ী এবং একপক্ষের সিদ্ধান্তে বাতিল করা সম্ভব নয়। যেকোনো পরিবর্তনের জন্য দুই দেশের সম্মতি প্রয়োজন।” তিনি ভারতের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক কৌশল ও জনমত শান্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে হামলার নিন্দা জানিয়ে ভারতের পাশে থাকার কথা বলেছে। তবে, মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি, আমরা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *