নেপালে সাম্প্রতিক সহিংসতা, প্রাণহানি এবং সম্পত্তির ধ্বংসের পর কেপি শর্মা ওলি সরকারের পতন ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য নেপাল সেনাবাহিনী এগিয়ে এসেছে। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব নিয়েছে। কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি রয়েছে, এবং সেনাবাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ভাঙচুর, লুটপাট বা ব্যক্তিগত ও সরকারি সম্পত্তির উপর হামলার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নেপাল সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল (৫৮) বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে জাতির উদ্দেশে এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমরা আন্দোলনরত গোষ্ঠীকে অনুরোধ করছি, তাদের কর্মসূচি বন্ধ করে আলোচনার জন্য এগিয়ে আসুন। আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে, ঐতিহাসিক ও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং জনগণ ও বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন “নেপালের ইতিহাসের শুরু থেকেই সেনাবাহিনী সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকেছে, কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায়।”
জেনারেল সিগদেল ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া সহিংসতায় প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং আন্দোলনকারীদের সংযমী ও শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন।
সেনাবাহিনীর বিবৃতি
নেপাল সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কিছু গোষ্ঠী বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাধারণ নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির মারাত্মক ক্ষতি করছে। তারা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ব্যক্তিগত বা সরকারি সম্পত্তির উপর হামলা, এমনকি ধর্ষণের চেষ্টার মতো ঘটনাগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী এসব কার্যক্রম দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
সেনাবাহিনী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিংহদরবার সচিবালয়, সংসদ ভবন এবং দেশের সীমান্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কারফিউ বলবৎ থাকলেও জরুরি পরিষেবা যেমন অ্যাম্বুলেন্স এবং মৃতদেহবাহী গাড়ির চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ এবং মিডিয়াকর্মীদের গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি তথ্যের উপর নির্ভর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আন্দোলনের পটভূমি
৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রাথমিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে শুরু হয়েছিল, যা পরে সরকারি দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, এবং রাজনীতিবিদদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীরা, যারা নিজেদের ‘জেন জি’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন, দাবি করছেন যে, রাজনীতিবিদদের বিলাসবহুল জীবন এবং সাধারণ নেপালি জনগণের দারিদ্র্যের মধ্যে বিশাল বৈষম্য রয়েছে।
আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়, এবং সরকারি ভবন, সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, এবং রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলিতে ১৯ জন নিহত হওয়ার পর ক্ষোভ আরও তীব্র হয়, এবং প্রতিবাদ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউডেলও পদত্যাগ করেছেন, ফলে দেশে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের আহ্বান ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি
প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউডেল বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “গণতন্ত্রে জনগণের দাবি সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে।” তবে, নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্টতা নেই।
কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন শাহ আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগে কোনো আলোচনা হবে না। তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং একটি সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে জল্পনা চলছে।
আরও পড়ুন: নেপালে বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী ওলি’র পদত্যাগ
নেপালে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। বর্তমান আন্দোলন, যা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে চলছে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন। জেনারেল অশোক রাজ সিগদেলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, তবে রাজনৈতিক শূন্যতা এবং আন্দোলনের তীব্রতা দেশকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































