শুক্রবার ইসরাইল ইরানের নাতাঞ্জে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা এবং সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়, যাতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান হোসেইন সালামিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার ও বিজ্ঞানী নিহত হন। এই হামলার পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাকে “অর্থহীন” বলে মন্তব্য করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এমন আচরণ করেছে যা তাদের সঙ্গে সংলাপকে অর্থহীন করে তুলেছে। আপনি একই সঙ্গে ইসরাইলকে সমর্থন ও ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা করতে পারেন না।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটনের সম্মতি ছাড়া ইসরাইল এই হামলা চালাতো না।
হামলার জবাবে ইরান শুক্রবার রাতে ও শনিবার সকালে তেল আবিবের আশপাশে সাতটি স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যাতে দুই ইসরাইলি নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হন। ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, তারা আলোচনা ব্যর্থ হলে হামলার আশঙ্কা করলেও, ওমানে ১৫ জুনের আলোচনার আগে এটি প্রত্যাশিত ছিল না। তারা ইসরাইলি প্রচারণাকে আলোচনায় চাপ সৃষ্টির কৌশল মনে করেছিল, যা তাদের প্রস্তুতিতে শৈথিল্য এনেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানকে পারমাণবিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ১২ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ওমানে ইরানের সঙ্গে ছয় দফা পরোক্ষ আলোচনার পরিকল্পনা করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। তবে, ট্রাম্প ১১ জুন একটি পডকাস্টে বলেন, তিনি আলোচনার সাফল্যে “আগের তুলনায় কম আত্মবিশ্বাসী” এবং ইরানের অবস্থানকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে অভিহিত করেন। হামলার পর ইরান ওমান আলোচনায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে “অস্তিত্বের হুমকি” বলে বর্ণনা করে এর সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি জানিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোর্ডোর সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলার জন্য সমর্থন চেয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প মে মাসে এটিকে “অনুপযুক্ত” বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে, নেতানিয়াহু ১২ জুন ঘোষণা দেন, হামলা ইরানের “পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা” ধ্বংস করতে এবং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের শুরু। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়াই হামলার পরিকল্পনা করেছিল, যদিও এটি ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করেছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ৩১ মে রিপোর্ট করে যে, ইরান সামরিক-গ্রেড ইউরেনিয়ামের রেকর্ড পরিমাণ মজুদ করেছে, যা প্রতি মাসে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য যথেষ্ট। ১০ জুন আইএইএ’র বোর্ড অব গভর্নরস ইরানের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের প্রস্তুতি নেয়, যা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পথ প্রশস্ত করতে পারে। ইরান অভিযোগ করে, আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে “সরঞ্জাম” হিসেবে কাজ করছেন।
ইসরাইলের হামলা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে কূটনীতিকদের সরিয়ে নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পরিবারের সদস্যদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং আলোচনা স্থগিত হওয়ায় ট্রাম্পের পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরাইলের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির নথি সংগ্রহ করেছে, যা তারা শিগগির প্রকাশ করবে, যা আলোচনাকে আরও জটিল করতে পারে।
ইসরাইলের হামলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে। ইরানের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ কূটনৈতিক সমাধানের পথে বড় বাধা। নেতানিয়াহুর আগ্রাসী কৌশল এবং ইরানের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। আইএইএ’র তদন্ত এবং সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































