Netanyahu-নেতানিয়াহু-newsedge24

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা সিটি দখল পরিকল্পনা নিয়ে বলেছেন, “আমরা গাজা দখল করতে যাচ্ছি না, বরং গাজাকে হামাসের হাত থেকে মুক্ত করতে যাচ্ছি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি শান্তিপূর্ণ বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা জিম্মিদের মুক্তি ও ভবিষ্যৎ হুমকি প্রতিরোধে সহায়ক হবে। এ খবর প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রীসভা গত বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট ২০২৫) নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুমোদন করে, যার মাধ্যমে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী গাজা সিটির নিয়ন্ত্রণ নেবে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, এই পরিকল্পনায় পাঁচটি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে:

  • হামাসের নিরস্ত্রীকরণ
  • সকল জিম্মির মুক্তি
  • গাজার নিরস্ত্রীকরণ
  • গাজায় ইসরাইলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ
  • হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ব্যতীত একটি বিকল্প বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা

নেতানিয়াহু ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরাইল গাজায় দীর্ঘমেয়াদী শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে না, বরং একটি “নিরাপত্তা ঘেরাও” তৈরি করে আরব বাহিনীর হাতে শাসন হস্তান্তর করতে চায়।

আন্তর্জাতিক সমালোচনা

ইসরাইলের এই পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এটিকে “বিপর্যয়কর” বলে অভিহিত করে বলেন, এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি, এবং হত্যার ঝুঁকি বাড়াবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এই পরিকল্পনা “অবিলম্বে বন্ধ” করার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই পরিকল্পনাকে “ভুল” বলে সমালোচনা করে বলেন, এটি যুদ্ধ বন্ধ বা জিম্মি মুক্তিতে কোনো সহায়তা করবে না, বরং আরও রক্তপাত ডেকে আনবে। জার্মানি গাজায় ব্যবহার হতে পারে এমন সন্দেহে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেন, ইসরাইলের এই সামরিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য “ক্রমশ অস্পষ্ট” হয়ে উঠছে।

চীন, তুরস্ক, মিশর, জর্ডান, সৌদি আরব, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশ এই পরিকল্পনার নিন্দা করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই বিষয়ে আলোচনার জন্য রোববার (১০ আগস্ট ২০২৫) জরুরি বৈঠক ডেকেছে, যা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, গ্রিস, এবং স্লোভেনিয়ার অনুরোধে আয়োজিত হবে।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা

ইসরাইলের বিরোধী দল এবং জিম্মিদের পরিবার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিরোধী নেতা ইয়ার ল্যাপিড বলেন, এই পরিকল্পনা সামরিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতামতের বিপরীতে এবং এটি “বিপর্যয়কর” ফলাফলের দিকে নিয়ে যাবে। জিম্মি পরিবারগুলোর সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে “জিম্মিদের মৃত্যুদণ্ড” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এটি জিম্মিদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবে এবং সৈন্যদের জন্যও বিপজ্জনক। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান ইয়াল জামিরও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন, তবে দীর্ঘ বিতর্কের পর এটি অনুমোদিত হয়।

হামাস এই পরিকল্পনাকে “নতুন যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, এটি জিম্মিদের মুক্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা জানিয়েছে, তারা সকল জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে যুদ্ধবিরতি এবং ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু নেতানিয়াহু এই প্রস্তাবে সাড়া দেননি।

গাজার মানবিক সংকট

প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরাইল-হামাস যুদ্ধে গাজার ২০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ৬১,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে বেসামরিক মানুষদের জন্য মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, গাজা সিটির দখল আরও বেসামরিক মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতির কারণ হবে, যা ইতিমধ্যে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে থাকা জনগণের জন্য বিপর্যয়কর হবে।

আরও পড়ুন: ইসরায়েলের গাজা দখলে বাধা দেবেন না যুক্তরাষ্ট্র

বিবিসি’র মতে, অনেক ইসরাইলি নেতা মনে করেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছেন তার জোট সরকারের টিকে থাকার জন্য, যা অতি-জাতীয়তাবাদী মন্ত্রীদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। তারা বলছেন, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব ফেলছে। ইসরাইলের অভ্যন্তরে শত শত মানুষ নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের সামনে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *