যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ঘোষণা করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা—ফরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্ফাহান—এ বোমা হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘অত্যন্ত সফল’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, ফরদো স্থাপনায় ‘পূর্ণ ক্ষমতার’ বোমা বর্ষণ করা হয়েছে। তিনি তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “সমস্ত বিমান এখন ইরানের আকাশসীমার বাইরে এবং নিরাপদে ফিরছে। আমাদের মহান আমেরিকান যোদ্ধাদের অভিনন্দন। বিশ্বে এমন কোনো সামরিক বাহিনী নেই যারা এটি করতে পারত। এখন শান্তির সময়!”
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ এবং ফার্স নিউজ এজেন্সি নিশ্চিত করেছে যে ফরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্ফাহান স্থাপনাগুলো ‘শত্রু পক্ষের আক্রমণের’ শিকার হয়েছে। তবে, ইরান দাবি করেছে, হামলার আগেই এই স্থাপনাগুলো থেকে পারমাণবিক সরঞ্জাম ও ইউরেনিয়াম মজুদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন সামরিক সূত্র জানায়, হামলায় বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে, যা মিজৌরির হোয়াইটম্যান বিমান ঘাঁটি থেকে শনিবার ভোরে উড্ডয়ন করে। এই বিমানগুলো ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি), যা ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ নামে পরিচিত, বহন করতে সক্ষম। এই বোমা ফরদোর মতো ৮০-৯০ মিটার গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা। ফক্স নিউজের সাংবাদিক শন হ্যানিটি জানান, ট্রাম্প তাকে বলেছেন, ফরদোতে ছয়টি বাঙ্কার-বাস্টার বোমা এবং নাতাঞ্জ ও ইস্ফাহানে ৩০টি টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প শনিবার রাত ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৮টা) হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, যেখানে তিনি এই অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরবেন। তিনি ভাষণে বলবেন, এই হামলা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও বিশ্বের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’।
ফরদো ইরানের সবচেয়ে গোপন ও শক্তিশালী পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যা কোম শহরের কাছে পাহাড়ের নিচে প্রায় ৮০-৯০ মিটার গভীরে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৩ সালে রিপোর্ট করেছিল, ফরদোতে ৮৩.৭% বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হচ্ছিল, যা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০% বিশুদ্ধতার খুব কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, ফরদো ধ্বংস করা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতাকে বছরের পর বছর পিছিয়ে দিতে পারে। তবে, ইরান দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে।
এই হামলা ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংঘটিত হয়েছে, যা ১৩ জুন ইসরায়েলের ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে শুরু হয়। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ফরদো ধ্বংসে সহায়তার জন্য চাপ দিচ্ছিল, কারণ তাদের নিজস্ব অস্ত্র এই গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর নয়।
ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য দুই সপ্তাহ সময় দেবেন। তবে, শুক্রবার জেনেভায় ইউরোপীয় ক্ষমতাধর দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় তিনি সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন। হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে হামলার আগে ও পরে কথা বলেছেন। নেতানিয়াহু এই হামলাকে ‘ইতিহাস পরিবর্তনকারী’ বলে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কূটনৈতিকভাবে জানিয়েছে, এই হামলা শুধু পারমাণবিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং তারা ইরানে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বুধবার সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ ডেকে আনবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছেন, মার্কিন হস্তক্ষেপ ‘সমগ্র অঞ্চলে সর্বাত্মক যুদ্ধের’ কারণ হতে পারে। তবে, এখনো ইরানের পক্ষ থেকে কোনো পাল্টা হামলার ঘোষণা আসেনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একজন ভাষ্যকার বলেছেন, এই হামলার পর অঞ্চলে অবস্থানরত প্রত্যেক মার্কিন নাগরিক ও সেনা ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা পুনরায় শুরু করবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই হামলার পর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক ডাকতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য, যেমন রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি, এই হামলাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে সমালোচনা করেছেন, যুক্তি দিয়ে যে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা শুধু কংগ্রেসের। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও তাঁর একটি সমাবেশে এই হামলার বিরোধিতা করে বলেছেন, “এটি যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই হামলা তাঁর আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা, যা ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। তবে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ইরান অতীতে অপ্রতিসম কৌশল, যেমন সন্ত্রাসী হামলা বা প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রতিশোধ নিয়েছে।
যদি হামলা ফরদোর স্থাপনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সফল হয়, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে পারে। তবে, ইরান যদি সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে থাকে, তবে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত হতে পারে। আইএইএ জানিয়েছে, নাতাঞ্জে ইসরায়েলের পূর্ববর্তী হামলায় তেজস্ক্রিয় দূষণ শুধু স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা ফরদোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন নির্ভর করছে তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির সিদ্ধান্তের ওপর। বিশ্লেষক জনাথন পানিকফ বলেন, “ইরান পিছু হটবে নাকি যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, তা খামেনির হাতে।” ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত’ শুরু হতে পারে।
এদিকে, ইসরায়েলে স্কুল বন্ধ ও জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইসরায়েলে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য তেল আবিব থেকে এথেন্সে দুটি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে।
এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক গতিপথকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে।









































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































