শেখ হাসিনা-hasina-newsedge4

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একসময় গণতন্ত্রের রক্ষক ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের রূপকার হিসেবে প্রশংসিত এই নেত্রী এখন অভিযুক্ত অঞ্চলের শান্তিকালীন সবচেয়ে নৃশংস দমন-পীড়নের নির্দেশদাতা হিসেবে। যাচাইকৃত অডিও রেকর্ডিং এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার ফলে জাতিসংঘের হিসেবে প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারায়।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত একটি জাতীয় অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার গভীর ত্রুটিগুলো উন্মোচন করে। এরপর সংঘটিত দমন-পীড়ন কোনো স্থানীয় প্রশাসনের ভুল ছিল না; বরং এটি ছিল উপর থেকে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এক সমন্বিত প্রয়াস। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণহত্যা, যা এই আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন হিসেবে বিবেচিত, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ১,০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটায়। এই স্বৈরতান্ত্রিক পতন হঠাৎ ঘটেনি। গত দশকে শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করেছেন এবং নজরদারি, সেন্সরশিপ ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করেছেন।

প্রমাণের দলিল

১৮ জুলাই ২০২৪-এর একটি ফাঁস হওয়া অডিওতে শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তা বাহিনীকে “প্রাণঘাতী অস্ত্র” ব্যবহারের নির্দেশ দিতে শোনা যায়, যেখানে তিনি বলেন, “যেখানে পাবে, সোজা গুলি করবে।” বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) এবং ফরেনসিক অডিও বিশেষজ্ঞ সংস্থা ইয়ারশট এই রেকর্ডিং যাচাই করেছে, যারা এতে কোনো সম্পাদনা বা কৃত্রিমতার প্রমাণ পায়নি। এই অডিও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের মূল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অতিরিক্ত প্রমাণের মধ্যে রয়েছে পুলিশের সামরিক গ্রেডের রাইফেল দিয়ে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো এবং সরকারি নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও দমন।

১০ জুলাই ২০২৫-এ আইসিটি শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। হাসিনা ও খানের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু হয়েছে, যখন আল-মামুন অপরাধ স্বীকার করে আদালতের সাক্ষী হিসেবে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল ৩ আগস্ট প্রসিকিউশনের উদ্বোধনী বক্তব্য এবং ৪ আগস্ট সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছে। এর আগে, ২ জুলাই ২০২৫-এ হাসিনাকে আদালত অবমাননার দায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা তিনি গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণ না করলে কার্যকর হবে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে, কিন্তু ভারত এখনো সাড়া দেয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। এই সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য আইন সংশোধন করেছে। তবে, সরকার নিজেই প্রতিবাদ দমন, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণের অভিযোগের মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থকদের বিরুদ্ধে ১,০০০টির বেশি মামলা দায়ের এবং ১,৩০০টির বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের উপর ২,৪৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেও অব্যাহত রয়েছে।

আরও পড়ুন: জুলাই-আগস্ট গণহত্যায় জড়িত ছিলাম, আমি দায়ী: আইজিপি মামুন

২০২৪ সালের দমন-পীড়ন বাংলাদেশের তরুণদের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যারা তাদের বন্ধুদের প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছে। এই সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে: একটি শক্তিশালী সরকার যদি নিজ জনগণের উপর এমন সহিংসতা চালায়, তবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে? বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার শুধুমাত্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং এই নৃশংসতার জাতীয় বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। এই বিচার প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্য।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিলে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের প্রতি সরকারের আচরণই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সূত্র: দ্য স্টেটসম্যান থেকে অনুবাদিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *