মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দার ছায়া-newsedge4

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মার্কিন অর্থনীতি ০.৩০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথম কোনো প্রান্তিকে সংকোচনের ঘটনা। গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ২.৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য পতন। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুত করেছেন এবং ভোক্তা ব্যয় হ্রাস পেয়েছে, যা অর্থনীতির এই সংকোচনের অন্যতম কারণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নীতি, যদিও ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকেও অর্থনৈতিক সংকোচনের শঙ্কা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে মন্দার কবলে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প অবশ্য তার শুল্ক নীতির পক্ষে অটল। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস উইথ কার্স্টেন ওয়েলকার’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে মন্দা হলেও দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতি “ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী” হবে। তিনি ওয়াল স্ট্রিটের কিছু বিশ্লেষকের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন, তার নীতি অর্থনীতিকে অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে, বাস্তবতা এই আশাবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় ব্যবসায়িক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এই অস্থিতিশীলতাকে আরও তীব্র করছে।

ট্রাম্পের প্রশাসন এই শুল্ক নীতিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্টক বেসেন্ট স্বীকার করেছেন, এই পরিবর্তনের জন্য কিছুটা সময় লাগবে এবং অর্থনীতিতে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ট্রাম্পের নীতির প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিও মন্দার ঝুঁকির মুখে। রয়টার্সের একটি জরিপে ৫০টি দেশের অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ব্যবসায়িক পরিবেশের অবনতি ঘটিয়েছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, চলতি বছর মন্দার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যেখানে তিন মাস আগেও তারা শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য চুক্তি ও প্রতিরক্ষা জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। স্টেট স্ট্রিটের কৌশলবিদ টিমোথি গ্রাফ রয়টার্সকে বলেন, এই পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশাবাদী হওয়া কঠিন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বৃদ্ধি কার্যকর হলেও, নতুন শুল্ক নীতি মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি করছে। এটি ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মার্কিন অর্থনীতির এই সংকোচন শুধু দেশটির জন্যই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি সতর্কতার ঘণ্টা। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ট্রাম্পের শুল্ক নীতি যদি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তে অস্থিরতা বাড়ায়, তবে এর প্রভাব অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা মার্কিন রপ্তানি বাজারের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি মারাত্মক হতে পারে।

ট্রাম্পের দাবি, তার নীতি দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি মন্দার ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা বিবেচনায়, এই নীতির ফলাফল নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক নীতির পরিবর্তে মুক্ত বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর জোর দেওয়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। বর্তমান সংকটে ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করা, যাতে মন্দার এই ছায়া কেটে গিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে ফিরতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *