জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন খুলনার তিন নেতা

১২ এপ্রিল, ২০২৫ শনিবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে, রওশন এরশাদপন্থী জাতীয় পার্টির তিনজন প্রভাবশালী নেতা—প্রেসিডিয়াম সদস্য ও খুলনার সংসদ সদস্য আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মোল্যা শওকত হোসেন, এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম মাসুদুর রহমান—জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে তাদের দলীয় পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘটনা জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের অতীত জোটের প্রেক্ষিতে উল্লেখযোগ্য। নেতারা জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করে ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

পদত্যাগকারী নেতাদের পরিচয়:

আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস – জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং খুলনা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।

মোল্যা শওকত হোসেন – জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি।

এস এম মাসুদুর রহমান – জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।

এই তিন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস, যিনি দলের অতীত কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন:

 “১৯৯০ সালে সরকার পতনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয়। আমরা আশা করেছিলাম অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের পাশে থেকে দল রাজনীতি করে যাবে। কিন্তু দেখলাম জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা ১৯৯০ সালের পর থেকে নিজস্ব রাজনীতিতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং প্রায় সময়ই ক্ষমতাসীনদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।”

“মূলত ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জাতীয় পার্টি কার্যকর বিরোধী দল বা ক্ষমতাসীন দল কোনোটাই হতে পারেনি। শীর্ষ নেতারা তাঁদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পতিত স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে।”

“ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘতর করতে জাতীয় পার্টি অনুঘটকের কাজ করেছে, যাতে তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের সায় ছিল না। সর্বশেষ দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে অনুগত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় পার্টি এই দায় এড়াতে পারে না।”

 “আমরা চাই দেশে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। বর্তমান অন্তবর্তী সরকার জাতিকে বড় ধরনের সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে। আমরা রাষ্ট্রের পূর্ণ সংস্কার চাই। যাতে করে ভবিষ্যতে জনগণের দোহাই দিয়ে আর কোনো স্বৈরশাসক জাতির কাঁধে চেপে বসতে না পারে।”

 খুলনার স্থানীয় জনগণের মধ্যে এই পদত্যাগ মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ নেতাদের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়াকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অংশ হতে পারে।

রওশন এরশাদপন্থী জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনও এই পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনা দলের জন্য আরেকটি ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের নেতারা এই ঘটনাকে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।

জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন ধরে রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে বিভক্ত। এই পদত্যাগ দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে আরও প্রকট করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের পতন ঘটে। এই ঘটনা জাতীয় পার্টির মতো আওয়ামী লীগের সহযোগী দলগুলোকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নেতাদের পদত্যাগ এই প্রেক্ষাপটেরই একটি ফলাফল। নেতারা বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছেন।

আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস, মোল্যা শওকত হোসেন, এবং এস এম মাসুদুর রহমানের পদত্যাগ এবং জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা জাতীয় পার্টির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *