ঢাকার অপরাধ জগতের কুখ্যাত নাম সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী এবং তাঁর সহযোগী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে কুষ্টিয়ায় একটি অভিযানে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মঙ্গলবার ভোরে কুষ্টিয়া শহরের কালিশঙ্করপুর এলাকার সোনার বাংলা রোডের একটি তিনতলা ভবনে যৌথ বাহিনীর অভিযানে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার হাতিরঝিল থেকে আরও দুই সহযোগী, শুটার আরাফাত ও শরিফ, গ্রেপ্তার হন। অভিযানে পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, দশটি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা ‘সেভেন স্টার’ সন্ত্রাসী দলের নেতা এবং ২০০১ সালের তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম। সুব্রত বাইনের নামে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও নাশকতার একাধিক মামলা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়, যাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা নাশকতা ছাড়াই সাফল্য অর্জিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাংলাদেশ পুলিশ এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুব্রত বাইন নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি হত্যা মামলা এবং প্রায় ১০০টি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ভারত থেকে অস্ত্র এনে তিনি খুন ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে পুলিশ সূত্র জানায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে সেনা সদস্যরা কালিশঙ্করপুরের সোনার বাংলা রোডের একটি তিনতলা ভবন ঘিরে ফেলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযানে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভবনটির মালিক ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মীর মহিউদ্দিন, যিনি দুই মাস আগে মারা যান। ভবনের নিচতলায় সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ প্রায় পাঁচ মাস ধরে ভাড়া থাকতেন। স্থানীয়রা জানান, সুব্রত বাইন সোনার বাংলা মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন, কিন্তু তাঁর পরিচয় গোপন ছিল।
আইএসপিআরের পরিচালক লে. কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী বলেন, “এই সফল অভিযান দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে। জনগণকে সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে নিকটবর্তী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
অপরাধ জগতের কুখ্যাত নাম ত্রিমাতি সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী। নব্বইয়ের দশকে মগবাজার, রমনা, কারওয়ান বাজার ও মধুবাগের আধিপত্যকারী এই শীর্ষ সন্ত্রাসী দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও খুন-জখমের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়েছেন তিনি।
১৯৬৭ সালে ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া সুব্রত বাইন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার জোবারপাড় গ্রামের সন্তান। মা ও তিন বোনের সঙ্গে মগবাজারে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। বরিশালের অক্সফোর্ড মিশন স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলেও ঢাকার শেরেবাংলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। সিদ্ধেশ্বরী কলেজে ভর্তির সময় এক নেতার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। এরপর মগবাজারে গড়ে তোলেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী।
১৯৯৩ সালে মধুবাজারে এক সবজিবিক্রেতা খুনের ঘটনায় পুলিশের নজরে আসেন সুব্রত। মগবাজারের বিশাল সেন্টার নির্মাণের সময় চাঁদাবাজির ঘটনায় তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯১ সালে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা মুরাদ খুনের মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হয়। রাজনীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির হয়ে কাজ করে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হন। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিতি তাঁকে ‘তারকা সন্ত্রাসী’র তকমা এনে দেয়। পরে যুবলীগ নেতা লিয়াকতের সঙ্গে মগবাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান।
২০০১ সালে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির পর কলকাতায় পালিয়ে যান সুব্রত। সেখানেও অপরাধে সক্রিয় থাকেন। ২০০৮ ও ২০১২ সালে কলকাতা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। নেপালেও পালিয়ে যান, কিন্তু আবার ধরা পড়েন। সম্প্রতি ভারত থেকে অস্ত্র এনে ঢাকার হাতিরঝিল ও গুলশানে খুন, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের ঘটনায় জড়িয়েছেন বলে পুলিশ সূত্র জানায়।



















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































