BNP-flag-newsedge4

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও মতানৈক্য প্রকাশ করেছে। বিএনপি’র ঐকমত্য ও মতানৈক্যের বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো, যা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংকলিত।

ঐকমত্যের বিষয়সমূহ

১. সংবিধান সংস্কার

  • ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার: বিএনপি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারে সম্মতি জানিয়েছে, যা সংসদীয় কার্যক্রমে স্বাধীনতা ও নমনীয়তা নিশ্চিত করবে।
  • প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ: প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বকাল সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাবে বিএনপি সম্মত হয়েছে, যদিও এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাধারণ নয়। এটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গৃহীত।
  • প্রধান বিচারপতি নিয়োগ: বিএনপি তাদের প্রাথমিক প্রস্তাব থেকে সরে এসে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
  • রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা: সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে।
  • সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগ: জাতীয় সংসদে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের জন্য বরাদ্দ এবং আসন সংখ্যার অনুপাতে সভাপতির পদ বণ্টনের প্রস্তাবে একমত।

২. নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার

  • ১৪১টি সুপারিশে ঐকমত্য: নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের ২৪৩টি সুপারিশের মধ্যে ১৪১টিতে বিএনপি সম্মত।
  • ১৪টি সুপারিশে আংশিক ঐকমত্য: ১৪টি সুপারিশে আংশিকভাবে একমত, যেখানে আইনি ও বিধিগত সংশোধন প্রয়োজন।
  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তন: নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাবে সম্মত।
  • নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ: সীমানা বিন্যাসে সংস্কারের জন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ সংশোধন ও বিশেষায়িত কমিটি গঠনের প্রস্তাবে ঐকমত্য।
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সকল প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে।

৩. জনপ্রশাসন সংস্কার

  • ১৮৭টি সুপারিশে ঐকমত্য: জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২০৮টি সুপারিশের মধ্যে ১৮৭টিতে একমত।
  • ৫টি সুপারিশে আংশিক ঐকমত্য: ৫টি সুপারিশে আংশিকভাবে একমত।

৪. বিচার বিভাগীয় সংস্কার

  • ৬২টি সুপারিশে ঐকমত্য: বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের ৮৯টি সুপারিশের মধ্যে ৬২টিতে সম্মত।
  • ৯টি সুপারিশে আংশিক ঐকমত্য: ৯টি সুপারিশে আংশিকভাবে একমত।
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ক সকল প্রস্তাবে সম্মতি।
  • হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ: বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে সম্মত, তবে বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরামর্শ।

৫. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার

  • ৪৬টি সুপারিশে ঐকমত্য: দুদক সংস্কার কমিশনের ৪৭টি সুপারিশের মধ্যে ৪৬টিতে সম্মত।

৬. পুলিশ সংস্কার

  • র‍্যাব বিলুপ্তি: পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রায় সকল প্রস্তাবে ঐকমত্য, বিশেষ করে র‌্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে।

৭. অন্যান্য

  • ন্যায়পাল আইন: ন্যায়পাল আইনকে যুগোপযোগী করার প্রস্তাবে সম্মত।

মতানৈক্যের বিষয়সমূহ

১. সংবিধান সংস্কার

  • জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি): বিএনপি এনসিসি গঠনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে, কারণ এটি অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট নয়। দলটি মনে করে, এটি গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
  • প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস: প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা হ্রাসের প্রস্তাবে বিএনপি একমত নয়। দলটি মনে করে, নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: কমিশনের প্রস্তাবিত ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরিবর্তে বিএনপি বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচনের পক্ষে।
  • জরুরি অবস্থা ঘোষণা: এনসিসি’র মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবে বিএনপি একমত নয়। দলটি মনে করে, এই ক্ষমতা সরকার ও সংসদের মধ্যে থাকা উচিত।
  • নাগরিক অধিকার স্থগিত: জরুরি অবস্থায় নাগরিক অধিকার রদ বা স্থগিত না করার প্রস্তাবে বিএনপি একমত নয়, কারণ এটি জরুরি অবস্থার উদ্দেশ্যকে অস্পষ্ট করে।
  • রাষ্ট্রের মূলনীতি: বিএনপি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত করার প্রস্তাব সমর্থন করে, যা বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে মতপার্থক্য সৃষ্টি করেছে।

২. নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার

  • ২৪টি সুপারিশে মতানৈক্য: ২৪টি সুপারিশ বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে বিএনপি মনে করে।
  • নির্বাচন কমিশনের গঠন: বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের আইনকে দুর্বল ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয় বলে বিএনপি সমালোচনা করেছে। দলটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের জন্য আইনি সংস্কার চায়।

৩. জনপ্রশাসন সংস্কার

  • ১১টি সুপারিশে মতানৈক্য: প্রদেশ সৃষ্টি, পদোন্নতি ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে ১১টি সুপারিশে বিএনপি একমত নয়।
  • পদোন্নতি বিষয়ে আপীল বিভাগের রায়: বিএনপি মনে করে, পদোন্নতির বিষয়ে আপীল বিভাগের রায় কার্যকর থাকা উচিত।

৪. বিচার বিভাগীয় সংস্কার

  • ১৮টি সুপারিশে মতানৈক্য: ১৮টি সুপারিশে বিএনপি ভিন্নমত প্রকাশ করেছে, যেখানে যুক্তিসহ পরামর্শ দিয়েছে।

৫. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার

  • ২৯ নম্বর সুপারিশ: আইনের মাধ্যমে দুদকের কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে বিএনপি আদালতের অনুমতির বিদ্যমান বিধান বজায় রাখার পক্ষে। দলটি মনে করে, এটি না হলে দুদকের কার্যক্রমে অহেতুক বিলম্ব হবে।

৬. পুলিশ সংস্কার

  • পুলিশ সংস্কার কমিশনের বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরি আলোচনায় আসেনি, তবে র‍্যাব বিলুপ্তি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে কিছু মতানৈক্য থাকতে পারে।

আরও পড়ুন: বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত

বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা করছে। দলটি সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে যুক্তিগ্রাহ্য মতামত ও তথ্য প্রমাণের মাধ্যমে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। বিএনপি মনে করে, নির্বাচিত সংসদ ও সরকারকে দুর্বল করার কোনো প্রস্তাব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনগণকে সম্পৃক্ত না করে বা তাদের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে বড় ধরনের পরিবর্তনের অধিকার কোনো দল বা কমিশনের নেই বলে বিএনপি মনে করে। এই বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি, তাই বিএনপি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত দেয়নি।

বিএনপি’র মতে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে আগ্রহ ও প্রত্যাশার পাশাপাশি হতাশা ও উৎকণ্ঠাও রয়েছে। দলটি মনে করে, নতুন নতুন প্রস্তাব এবং অচলাবস্থার কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। তবে তারা ধৈর্য ধরে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশনকে সহযোগিতা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *