রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-newsedge24

বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০ থেকে ২৭ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত প্রি-অপারেশনাল সেফটি রিভিউ টিম (প্রি-ওএসএআরটি) মিশন পরিচালনা করেছে। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আগে নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও কার্যক্রম মূল্যায়ন করা। এ তথ্য জানিয়েছে আমেরিকান নিউক্লিয়ার সোসাইটি পরিচালিত অনলাইন নিউক্লিয়ার নিউজওয়্যার।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনা জেলার পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত, যা রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১০০ মাইল (১৬০ কিলোমিটার) উত্তর-পশ্চিমে। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশনের মালিকানাধীন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড দ্বারা পরিচালিত হবে। কেন্দ্রটিতে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। ইউনিট-১ এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ৩০ নভেম্বর ২০১৭ এবং ইউনিট-২ এর কাজ শুরু হয় ১৪ জুলাই ২০১৮।

আইএইএ’র পরিদর্শন ও মূল্যায়ন

প্রি-ওএসএআরটি মিশনের লক্ষ্য ছিল রূপপুর ইউনিট-১ এর নিরাপত্তা মান আইএইএ’র আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে মূল্যায়ন করা। পরিদর্শন টিম নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করেছে:

  • নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা
  • কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা
  • অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ
  • প্রযুক্তিগত সহায়তা
  • বিকিরণ সুরক্ষা ও রসায়ন
  • জরুরি পরিস্থিতি প্রস্তুতি
  • দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা
  • কমিশনিং প্রক্রিয়া

টিমটি ১৪ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত ছিল, যারা বুলগেরিয়া, চীন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছিলেন। এছাড়া আইএইএ’র কর্মী এবং রাশিয়ার একজন পর্যবেক্ষক টিমে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, কর্মী সংগঠন, দায়িত্ব ও অপারেশন ব্যবস্থাপনার নথি পর্যালোচনা করেন।

টিমের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ

আইএইএ টিম জানিয়েছে, রূপপুরের কর্মীরা পেশাদার, দক্ষ এবং নিরাপত্তা উন্নত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা বিশেষ করে রূপপুর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আধুনিক সিমুলেটরের মাধ্যমে রিফুয়েলিং মেশিন প্রশিক্ষণকে বিশ্বমানের অনুশীলন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে, তারা কিছু উন্নতির সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • অগ্নি প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার উন্নতি
  • অপারেশন তদারকির মান বৃদ্ধি
  • কমিশনিংয়ের সময় সরঞ্জাম সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা

আইএইএ’র সিনিয়র নিউক্লিয়ার সেফটি অফিসার সাইমন মরগান বলেন, “কমিশনিং থেকে পূর্ণ অপারেশনে রূপান্তর একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। টিম দেখেছে, ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সব শর্ত পূরণের পরই এই ধাপ সম্পন্ন হবে।”

টিম তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন রূপপুর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। বাংলাদেশ সরকার এতে মন্তব্য ও সুপারিশ জানাবে, এবং আইএইএ তা পর্যালোচনা করে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এছাড়া, আইএইএ’র সাধারণ প্রক্রিয়া অনুযায়ী, প্রাথমিক মিশনের দুই বছরের মধ্যে ফলোআপ মিশন পরিচালিত হবে।

আরও পড়ুন: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৮ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত, প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প, যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি বৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইএইএ’র এই পরিদর্শন বাংলাদেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *