মাহদী আমিন-newsedge24

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর রাত ১টার দিকে ‘আইডি হ্যাক’ দাবি করা কতটা যৌক্তিক। রোববার রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।

মাহদী আমিন বলেন, “আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে নারীদের উদ্দেশ্য করে যে নোংরা, জঘন্য ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে দেশব্যাপী আলোচনা চলছে, সেটি সঠিক হলে এর মাধ্যমে পুরো সমাজব্যবস্থাকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার প্রচেষ্টা বলে মনে করি।”

তিনি বলেন, “তিনি তার এক্স অ্যাকাউন্টের পোস্টে গতকাল তথা ৩১ জানুয়ারি বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে যা লিখেছেন, তার একটি অংশ অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—‘আমরা বিশ্বাস করি যে, যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়, এটি অন্য কোনো রূপে পতিতাবৃত্তির মতোই।’ উল্লেখ্য যে, তিনি এর আগেও আল জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।”

মাহদী বলেন, “জামায়াত আমিরের এই পোস্ট দেওয়া এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাওয়া দাবি করা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠে যে, নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে রাত ১টার দিকে আইডি হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক?”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সবাই জানি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো দ্রুততম সময়ে জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায় এবং সবাই সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এখানে দেখা গেল, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? এমনকি উক্ত সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অনেক পোস্ট হয়েছে, যার মধ্যে আমরা তার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কোনো পোস্ট দেখতে পাইনি।”

আরও পড়ুন: স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়: মির্জা ফখরুল

তিনি বলেন, “পরবর্তীতে আমরা লক্ষ্য করি, তারা গভীর রাতে তথা রাত ৩টা ৩০ মিনিটে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছেন। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে কেন জিডি করা হলো? এই বিলম্বের আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে কী? তাছাড়া হ্যাক হওয়া ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই একাউন্ট ফিরে পাওয়ার দাবিটিই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?”

মাহদী আমিন বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা সর্বদা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সমঅধিকারের পক্ষে। এই ধরনের ভাষা ও মানসিকতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা প্রকাশ্যেই নারীবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।”

তিনি আরও বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্য, এই রাজনৈতিক দলটির জন্য এটি নতুন কোনো আচরণ নয়। এর আগেও আমরা দেখেছি, একই দলের একজন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বোনদের উদ্দেশ্য করে ঠিক একই অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। আমরা দেখেছি, এই দলের প্রধান প্রকাশ্যে নারীদের কাজের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ বক্তব্য দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, যে দল মুখে মুখে ‘ইনসাফ কায়েমের’ কথা বলে বেড়ায়, সেই দলটি একটি আসনেও কোনো নারীকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি। এই বিষয়টি নিশ্চয়ই নারীদের প্রতি তাদের হীন মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।”

আরও পড়ুন: জনগণ যদি জোটকে ভোট দেন, আমরা কথা রাখব: জামায়াত আমির

তিনি বলেন, “আমরা আরও দেখেছি, এই দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যুক্ত থাকার কারণেই জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু নারী নেত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। যারা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছেন, তারাও স্বীকার করেছেন যে এই দলটির কারণে তারা নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।”

মাহদী বলেন, “এমনকি নারী প্রার্থীদের পোশাক-পরিচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা চরম রুচিহীনতা ও নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, বিভিন্ন আসনে আমাদের প্রার্থীদের নারী সদস্যরা নির্বাচনি প্রচারণায় নামলে তাঁদেরকেও অনলাইন, অফলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নারী সদস্যরা, বিশেষ করে আমাদের ছাত্রদলের বোনেরা, সাইবার স্পেসে যে সীমাহীন, বর্বর ও মধ্যযুগীয় বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন, তা যে কোনো সচেতন মানুষকে আতঙ্কিত করবে। এসব অপপ্রচারে জড়িত আইডিগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়, এগুলো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড।”

মাহদী আমিন বলেন, “যুগে যুগে আমরা দেখেছি আমাদের নারীরা কীভাবে সব সংকটে সংগ্রামে অগ্র পথে এগিয়ে এসেছেন। আমরা দেখি, আমাদের মায়েরা, বোনেরা, স্ত্রী ও কন্যারা কীভাবে ঘরে বাইরে আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আমরা দেখি আমাদের নারীরা শ্রম দিয়ে, ঘাম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন। এই যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বিশ্বজয়, তার বিরাট একটা অংশ জুড়ে আমাদের নারীদের অবদান।”

তিনি আরও বলেন, “স্কুলে যে নারী শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন, হাসপাতালে যে নারী ডাক্তার ও নার্স হিসেবে মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছেন, পুলিশ হিসেবে যে নারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন, আইনজীবী হিসেবে যে নারী বিপন্ন মানুষকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন, যে নারী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখছেন, যে নারী প্রশাসনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, যে নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন, যে নারী সাংবাদিক হিসেবে গণমাধ্যমে কাজ করছেন, কিংবা যে নারীরা বিভিন্ন খেলাধুলায় দেশের হয়ে লড়ছেন, ভাবা যায়, এই সব কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে জামায়াতের কী অপমানজনক নারীবিদ্বেষী অবস্থান!”

আরও পড়ুন: একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে চায়: তারেক রহমান

মাহদী বলেন, “বছর দেড়েক আগেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি আমাদের বোনেরা কীভাবে মিছিলে স্লোগান ধরেছে, কীভাবে পুলিশের গাড়ির সামনে প্রবল সাহসে দাঁড়িয়ে গেছে, দেখেছি কীভাবে কবিতায়, গানে, দ্রোহে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। আমাদের মায়েরা পানি হাতে, বাসায় বানানো পিঠা হাতে রাস্তায় নেমে এসেছেন। আমরা জানি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের নারীরা কীভাবে লড়াই করেছেন। জাতি আমাদের মা-বোনদের এই আত্মত্যাগ কখনোই অস্বীকার করতে পারে না।”

তিনি বলেন, “যখনই কোনো সংকট আসে, একটি পক্ষ তখনই নারীদেরকে আঘাত করার নোংরা নারীবিদ্বেষী পথ বেছে নেয়। আমরা জানি, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একইভাবে নারীদেরকে অত্যাচার নিপীড়ন করার পথ বেছে নিয়েছিল শত্রুপক্ষ। লাখো মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর কালো অধ্যায় পেরিয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। মায়ের মতই দেশ কিংবা দেশই তো আমাদের মা। তাদের উপরে আর কোনো অন্যায় অবিচার নিপীড়ন নির্যাতন আমরা মেনে নেব না, বিএনপি মেনে নেবে না, বাংলাদেশ মেনে নেবে না।”

মাহদী আমিন বলেন, “জামায়াত বলছে, মানুষ নাকি বিএনপিকে আগেই দেখেছে, এবার তাদেরকে দেখার পালা। কিন্তু দেশের মানুষ ইতোমধ্যেই দেখা শুরু করেছে, মধ্যযুগীয় বর্বরতার নামে কীভাবে অর্ধেক জনগোষ্ঠী তথা আমাদের মা ও বোনদের অপমান করা হচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, দেশজুড়ে ও অনলাইনে নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো পিছু হটা নেই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *