মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-010106-NewsEdge24

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। গুমের সঙ্গে জড়িত যেকোনো অপরাধীকে—তা যত বড় ক্ষমতাবানই হোক—বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন।

রাষ্ট্রপতি গুমকে সাধারণ অপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, এটি শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, তার পরিবারের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক স্বস্তিও ধ্বংস করে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে এসব অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়।

বিগত দেড় দশকে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর ভয়াবহতা দেশের ওপর চেপে বসেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন করলেই অনেককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অপরাধ অস্বীকার করে গেছে।

রাষ্ট্রপতি বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ গুমের শিকার অসংখ্য মানুষের কথা স্মরণ করেন। ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের বছরের পর বছর অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে আয়নাঘরে আটকে রাখার কথাও তিনি তুলে ধরেন। এমনকি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে ভিনদেশে ফেলে আসার ঘটনার উল্লেখ করেন।

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে গুম ও খুন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন: গুম-খুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারকাজ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এগিয়ে চলছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *