বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে কাতারকে জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে কাতারের নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কাতারের দোহায় আর্থনা শীর্ষ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তুচ্যুত জনগণের সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ-রোহিঙ্গা ইস্যু’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই আহ্বান জানান ড. ইউনূস। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, এবং এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।
ড. ইউনূস বলেন, “রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন শুরু করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কাতার তাদের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত প্রেক্ষাপটে কাতার সংহতি প্রকাশ করে এই সংকট সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।” তিনি ওআইসি সদস্য দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধির জন্য কাতারের নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বিশ্ববাসীকে মানবতা, স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচারের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন আমরা নিশ্চিত করি, আজকের আলোচনা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি অর্থবহ অংশীদারিত্বের সূচনা করে, যা রোহিঙ্গা সংকটকে আমাদের যৌথ মানবিক অগ্রাধিকারের শীর্ষে রাখে।”
ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, যেখানে প্রতি বছর ৩২,০০০ নবজাতক যুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অবৈধ অভিবাসনের চেষ্টা তাদের হতাশার প্রকাশ। এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলবে।”
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ রোহিঙ্গা সংকট থেকে সরে যাচ্ছে।” তিনি জানান, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের তালিকায় ৮,২৯,০৩৬ রোহিঙ্গার মধ্যে মিয়ানমার ২,৩৯,০৫৬ জনকে যাচাই করেছে, এবং ১,৭৬,১৯৮ জনকে মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ড. ইউনূস ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), এবং মিয়ানমারের জন্য গঠিত স্বাধীন তদন্ত সংস্থার (আইআইএমএম) উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি জানান, আইসিজে-তে দায়ের করা মামলা এ বছর মেরিট পর্বে পৌঁছাবে, এবং গণহত্যার শিকারদের ক্ষতিপূরণের জন্য আইনি ফার্ম ফোলি হোয়াগ আবেদন করবে।
তিনি বলেন, “গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি এড়ানো উচিত নয়। রোহিঙ্গাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
গাম্বিয়া সরকার ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত ওআইসি ২৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ ৭ লাখ ডলার অবদান রেখেছে। ড. ইউনূস ওআইসি দেশগুলোর কাছে আরও তহবিল সংগ্রহের আহ্বান জানান।
ড. ইউনূস জানান, বাংলাদেশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন’ আয়োজন করবে। তিনি এই সম্মেলনে কাতারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার প্রত্যাশা করেন।
বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। ড. ইউনূস বলেন, “টেকসই প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র সমাধান।” তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ড. ইউনূস কাতার ফাউন্ডেশনকে এই বৈঠক আয়োজন এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “কাতার ফাউন্ডেশন নীতিগত বিবৃতির বাইরে গিয়ে সংহতি ও জবাবদিহিতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।”






















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































