ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিকাব আয়োজিত ‘ডিকাব টক’ অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডেলিগেশন প্রধান মাইকেল মিলার বাংলাদেশের চলমান সংস্কার, আগামী জাতীয় নির্বাচন, জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং অন্যান্য সমসাময়িক বিষয়ে ইইউ’র অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে ইইউ’র পূর্ণ সমর্থন রয়েছে, এবং সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য সরকারকে ‘পর্যাপ্ত সময়’ দেওয়া উচিত।
মাইকেল মিলার বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বলেন, “বাংলাদেশে কখন নির্বাচন হওয়া উচিত, সে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব। তবে, নির্বাচনের আগে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইইউ বাংলাদেশ সরকারের উপর নির্বাচন নিয়ে কোনো চাপ সৃষ্টি করছে না। বরং, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে ইইউ’র অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সংস্কারের জন্য বড় সুযোগ এসেছে, এটিকে কাজে লাগাতে হবে।” ইইউ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সমর্থন করে এবং এমন নির্বাচনে সহায়তা প্রদানে আগ্রহী।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পূর্বে বলেছিলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। ইইউ’র রাষ্ট্রদূত এই সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কারের গুরুত্বের উপর জোর দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো একযোগে কাজ করে সংস্কার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবে।
মিলার জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ইতিমধ্যে ‘না’ ভোটের বিধান, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং নির্দলীয় প্রতীকে ভোটের মতো প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে, যা ৩ জানুয়ারি ২০২৫-এ সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য অর্জন এই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইইউ’র রাষ্ট্রদূত আশাবাদী যে, সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণআন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে মাইকেল মিলার বলেন, “এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিচার স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত।” তিনি এই বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবির প্রতি ইইউ’র সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। ড. ইউনূসের সরকার ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তা চেয়েছে, যা ইইউ ইতিবাচকভাবে দেখছে।
রাখাইনে মানবিক করিডর প্রসঙ্গে মিলার বলেন, “এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। উভয় পক্ষের ভুক্তভোগীদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, ত্রাণ বিতরণে সাম্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সবাই সমানভাবে সহায়তা পায়। ইইউ রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
ইউরোপে পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের বিষয়ে মিলার বলেন, “এই প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ হতে পারে এবং ৩-৪ বছর পর্যন্ত লাগতে পারে।” তিনি এই প্রক্রিয়ায় ইইউ’র সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি দলের ব্রাসেলস সফর প্রসঙ্গে মিলার বলেন, “জামায়াতের আগ্রহের ভিত্তিতে আমরা তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। বিএনপি, এনসিপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যও আমাদের দরজা খোলা।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বোঝার জন্য ইইউ’র আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন।
নারী সংস্কার কমিশন নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে মিলার বলেন, “এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে, ইইউ নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাসী এবং বিশ্বব্যাপী এটি প্রচার করে। আমরা বাংলাদেশে নারীদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি দেখতে চাই।”
ডিকাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিনের সঞ্চালনায় এবং সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মামুনের স্বাগত বক্তৃতায় অনুষ্ঠানটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়।



















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































