July2024-newsedge24

গত বছরের ১ জুলাই বাংলাদেশে ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হয়, যখন শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’ রূপ নেয়। এই আন্দোলন ২০০৮ সাল থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনের পতনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাথমিকভাবে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে ‘জুলাই বিদ্রোহ’-এ রূপান্তরিত হয়।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট:
২০১৮ সালে তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তবে, ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট এই প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে ৫৬% কোটা পুনর্বহাল করে, যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০%, নারীদের জন্য ১০%, পশ্চাৎপদ জেলার জন্য ১০%, সংখ্যালঘুদের জন্য ৫%, এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১% বরাদ্দ ছিল। শিক্ষার্থীরা এই ব্যবস্থাকে মেধাবীদের প্রতি বৈষম্য হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিবাদে নামে।

আন্দোলনের সূচনা:
৫ জুন হাইকোর্টের রায়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় নামে। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার বই ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’-তে লিখেছেন, “৫ জুন বিকেলে চানখারপুলে স্কুটি মেরামত করাচ্ছিলাম। ফেসবুকে দেখি, হাইকোর্ট কোটা পুনর্বহাল করেছে। মনে হলো, ২০১৮-এর অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।” ওইদিন সন্ধ্যায় ঢাবি’র কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে শিক্ষার্থীদের বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। রাত সাড়ে ৭টায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’ ব্যানারে মিছিল ও সমাবেশে হাইকোর্টের রায়কে ‘মেধাবীদের সঙ্গে তামাশা’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি:
৬ জুন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’র প্রধান নাহিদ ইসলাম রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশের ঘোষণা দেন। প্রায় ৫০০-৬০০ শিক্ষার্থী ‘কোটা পদ্ধতি মানি না’, ‘হাইকোর্টের রায় মানি না’ স্লোগানে মিছিলে অংশ নেয়। ঢাবি, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে যোগ দেয়। ৯ জুন শিক্ষার্থীরা অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর স্মারকলিপি জমা দেয়, যার প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগে রায় স্থগিতের আবেদন করা হয়। ১০ জুন আরেকটি মিছিলে সরকারকে ৩০ জুনের মধ্যে ২০১৮-এর প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।

জুলাই বিদ্রোহের সূচনা:
৩০ জুনের মধ্যে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ১ জুলাই সারাদেশে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। ঢাবি’র শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে মিছিল করে। নাহিদ ইসলাম ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন এবং তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন:

  • ২ জুলাই: দেশব্যাপী মহাসড়কে মিছিল।
  • ৩-৪ জুলাই: রাজু ভাস্কর্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাবি’র অধিভুক্ত কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে সমাবেশ।

নাহিদ চারটি দাবি উত্থাপন করেন:

  • পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত কোটা সংস্কারে কমিশন গঠন।
  • কোটা পূরণ না হলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ।
  • একাধিকবার কোটা সুবিধা ব্যবহার বন্ধ।
  • প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।

দমন ও পরিণতি:
সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি বিদ্রোহে রূপ নেয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারপন্থী সন্ত্রাসীদের আক্রমণে অন্তত ১,৪০০ জন নিহত এবং প্রায় ২০,০০০ জন আহত হন। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস দমনপীড়ন হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই বিদ্রোহ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকে অনিবার্য করে তোলে, যা শিক্ষার্থী ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *