শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে জয়-পরাজয় মেনে নিতে সব দলকে সিইসির অনুরোধ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর ঐতিহাসিক গণভোটের প্রাক্কালে দেশবাসীকে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি সকল রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক না কেন, তা সাহসের সাথে মেনে নেওয়ার এবং নির্বাচনের পর সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার অনুরোধ জানান।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সাধারণ নির্বাচন। গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্র সংস্কারের পর এটিই প্রথম সংসদীয় নির্বাচন, যেখানে একই সাথে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা নতুন সংবিধানিক কাঠামোর ওপর জনগণের রায় নেওয়ার জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এমন সংবেদনশীল মুহূর্তে সিইসি নাসির উদ্দিনের এই ভাষণ রাজনৈতিক উত্তাপ প্রশমনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সিইসি তার ভাষণে বলেন, “ভোট হলো নাগরিকের পবিত্র আমানত। আপনারা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন। মনে রাখবেন, জয় ও পরাজয় মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যারা জয়ী হবেন তারা যেমন অহংকারী হবেন না, তেমনি যারা পরাজিত হবেন তারা যেন কোনোভাবেই প্রতিহিংসার পথে না হাঁটেন।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ভাষণের মূল দিক ও গুরুত্ব

সিইসি নাসির উদ্দিন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল আমাদের উন্নয়ন নয়, বরং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রাণ। নির্বাচনের পর শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রতিটি প্রার্থী ও ভোটারের নৈতিক দায়িত্ব।” ভাষণে তিনি তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং তাদের সাহসিকতার সাথে ভোটকেন্দ্রে আসার আমন্ত্রণ জানান।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সংসদীয় আসনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের যে ৪টি স্তম্ভ (বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতা ও মৌলিক অধিকার) প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর ওপর ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।

শান্তিপূর্ণ ভোট ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

সিইসি তার ভাষণে গুজব প্রতিরোধে দেশবাসীকে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অসত্য তথ্যে বিভ্রান্ত না হতে তিনি ভোটারদের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, “আপনাদের একটি ভোট নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশের গতিপথ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে সহনশীলতার কোনো বিকল্প নেই।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই ভাষণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নির্বাচনের দিনে কোনো ধরনের সংঘাত এড়ানোর জন্য এটি ছিল একটি আগাম সতর্কবার্তা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশ যখন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দোরগোড়ায়, তখন সব পক্ষ যদি সিইসির এই আহ্বান মেনে চলে, তবেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত অর্জন সফল হবে।

এখন দেখার বিষয়, কালকের ভোট উৎসবে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা সহনশীলতার পরিচয় দেয় এবং জনগণের রায়কে কতটুকু সম্মানের সাথে গ্রহণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *