জাতীয় ঐকমত্য কমিশন-newsedge4

রবিবার সকাল সাড়ে দশটায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে ‘জুলাই সনদ’ তৈরির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফার সপ্তম দিনের আলোচনা শুরু করে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।

আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এবি পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, এবং সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে স্বতন্ত্র কমিটি গঠনসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো।

ড. আলী রীয়াজ তাঁর সূচনা বক্তব্যে বলেন, “কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিপক্ষ নয়। আমরা সরকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছি। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের একটি বিরাট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং তাদের মাধ্যমেই দেশ শাসিত হবে।” তিনি জানান, কমিশন বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে নমনীয়তা দেখিয়েছে, যেমন জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) প্রস্তাব বাতিল করে ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম শহীদ আবু সাঈদের শাহাদাতবার্ষিকীতে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে পারব। কিন্তু এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ওপর নির্ভর করছে। তবে জুলাইয়ের মধ্যে সনদ তৈরির প্রক্রিয়া একটি পরিণতির দিকে যাবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংবিধান সংস্কার জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যেন না হয়, এবং ব্যক্তির ক্ষমতা সীমিত করতে সাংবিধানিক ও বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার রক্ষাকবচ তৈরি করা জরুরি।

আলী রীয়াজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “বহু নিপীড়ন ও প্রাণের বিনিময়ে আমরা এখানে এসেছি। এটি আমাদের দায়িত্ব, এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের একমাত্র উপায় হলো ঐকমত্য গড়ে তোলা।” তিনি দলগুলোকে মতানৈক্য কমিয়ে দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানান।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জুনের বৈঠকের পর দলগুলোকে তিন দিনের বিরতি দেওয়া হয়েছিল মতানৈক্য নিরসনে আলোচনার জন্য। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে, বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, এবং এনসিসি গঠন নিয়ে। বিএনপি এনসিসি প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে, এবং সমমনা দলগুলো যেমন এলডিপি, এনডিএম, ও ১২ দলীয় জোট তাদের সঙ্গে একমত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া জুলাই সনদ কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে না।’ এদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের জুলাই সনদ ঘোষণায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে নিজস্ব ঘোষণাপত্র প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫-এ প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ১১টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কমিশন জুলাইয়ের মধ্যে সনদ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে প্রক্রিয়াটি জটিলতার মুখে পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *