আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে তা নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি আরও বলেন, এই মব সহিংসতা অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে শুরু হয়েছে।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেটি অন্য সবকিছুর মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও দায় আছে। সরকার শুরু থেকে মব সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপরতা দেখাতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে মব সহিংসতা শুরু হয়েছে সরকারের ভেতর থেকে। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের উৎপত্তি হয়েছিল। সরকারের বাইরের শক্তি যারা এখন মব করছে, তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে সচিবালয়ে মব সৃষ্টির পরে। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাতে হত্যাকাণ্ড না ঘটে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আর যেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা না হয়। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত নয়, এর পরবর্তী কয়েক দিনও থাকতে পারে। সরকার এই ঝুঁকির বিষয়টি ভালোভাবেই জানে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা তাদের রয়েছে। অতীতের নির্বাচনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হবে।”
জুলাই-পরবর্তী জবাবদিহির প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢালাওভাবে মামলায় জড়িয়ে সাংবাদিকদের আটক রাখা হয়েছে। পেশাগত অবস্থান অপব্যবহারের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া কতটুকু বিচার আর কতটুকু প্রতিশোধ—সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত অপরাধী, কর্তৃত্ববাদের দোসরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কতটুকু সম্ভব ও গ্রহণযোগ্য হবে, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধের প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, “রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা তাদের স্বার্থ বজায় রাখতে চায়। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনে জনগণের কাছে জবাবদিহি সরকারব্যবস্থার জন্য যে পদ্ধতিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি ছিল।”
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি বলেন, “নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক কনসেপ্ট ধারণ করলে আপত্তি থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিই বাস্তবায়িত হবে। এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি হবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। গণভোটের রায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গেলে সে ক্ষেত্রে যারা সরকারে যাবে, তাদের সদিচ্ছার ওপর সংস্কার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।”
সরকারের সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, “মিডিয়া বিশেষভাবে সরকার কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে এবং মিডিয়ার প্রতি নতুন করে ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের ও বাইরের শক্তি কাজ করেছে। বাইরের শক্তিকে সরকারই অতিক্ষমতায়িত করেছে।”
গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে পেশাদারত্বের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করুক—এ চিন্তাভাবনা অন্তর্বর্তী সরকার ধারণ করেছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি বলেন, “দুটি মিডিয়া কমিশন লোকদেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।”
আরও পড়ুন: নির্বাচনকে সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন সীমিতের উদ্যোগ
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারক নিয়োগ কমিটি, স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়ের মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সচিবালয় কতটুকু কার্যকর হবে, তার জবাব পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। এ ছাড়া বিচারব্যবস্থার ভেতরে দলীয়করণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।”



















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































