বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে?

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হতে যাওয়া বিএনপি শিবিরে এখন বইছে উৎসবের আমেজ। তবে এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাঝেই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে—কে হচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি?

দলীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, বঙ্গভবনের পরবর্তী অভিভাবক হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন দলের আরেক হেভিওয়েট নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিএনপি এখন সরকার গঠনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আগামীকাল মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর পদটি সবচেয়ে ক্ষমতাধর হলেও, রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য অভিভাবককে বঙ্গভবনে পাঠানোর বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

দলের একাধিক নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে দলে এক ধরণের সর্বসম্মত মনোভাব তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা-১ আসন থেকে পাঁচবার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য কেবল বিএনপির একজন শীর্ষ নেতাই নন, বরং একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তার দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং দলের দুঃসময়ে অবিচল নেতৃত্ব তাকে এই পদের জন্য সবচেয়ে এগিয়ে রেখেছে।

আলোচনায় নজরুল ইসলাম খানও

রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে খন্দকার মোশাররফের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে নজরুল ইসলাম খানের। শ্রমিক রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই প্রবীণ নেতা এবারের নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম এই সদস্যের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং তৃণমূলের সঙ্গে গভীর সংযোগ তাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তবে দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নজরুল ইসলাম খানকে রাষ্ট্রপতি পদের চেয়ে সরকার পরিচালনায় আরও সক্রিয় কোনো ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে সচিবালয়ের করিডোরে। সেক্ষেত্রে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বঙ্গভবন যাত্রা এক প্রকার সময়ের ব্যাপার বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনায় মূল ফ্যাক্টরসমূহ:

কেন এই দুই নেতার নামই বারবার ঘুরেফিরে আসছে, তার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ লক্ষ্য করা গেছে:

  • অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা: ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খান—উভয়েই বিএনপির দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা।

  • মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি: নতুন সরকার এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে চায় যার মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। খন্দকার মোশাররফ এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য।

  • দলের প্রতি আনুগত্য: ১/১১-এর সময় থেকে শুরু করে বিগত ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে দলের প্রতি তাদের ত্যাগ ও আনুগত্য প্রশ্নাতীত।

  • ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা: রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সব মহলে গ্রহণযোগ্য এবং মার্জিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসেবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে বেশি মানানসই মনে করছে দলের একাংশ।

বর্তমান রাষ্ট্রপতির অবস্থান ও আইনি প্রক্রিয়া

এদিকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়েও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। যদিও আইন অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত, কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা পদ শূন্য হলে সংসদীয় পদ্ধতিতে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

বিএনপি চাইছে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসেই রাষ্ট্রপতির বিষয়টি ফয়সালা করতে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবে দলটির কর্মীদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে ঘিরেই প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে।

শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি, তা জানতে সম্ভবত আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *