শেখ হাসিনা-newsedge4

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশন একটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিং যাচাই করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

১৮ জুলাই ২০২৪, গণভবন থেকে ফোনকল অডিওতে শেখ হাসিনাকে একজন অজ্ঞাত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। তিনি বলেন, “যেখানেই ওদের (বিক্ষোভকারী) পাবে, গুলি করবে।” বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) অডিওতে শেখ হাসিনার কণ্ঠ নিশ্চিত করেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফরেনসিক অডিও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘ইয়ারশট’ অডিওটি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছে যে এটি সম্পাদনা বা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়নি। বিশ্লেষণে ইলেকট্রিক নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি (ENF), কণ্ঠের ছন্দ, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ এবং ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা হয়েছে। অডিওটি ২০২৫ সালের মার্চে অনলাইনে ফাঁস হয়, যা বাংলাদেশের ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) রেকর্ড করেছিল। ফাঁসের উৎস অজানা।

আইনি পদক্ষেপ

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার নির্দেশ, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সহিংসতা, উসকানি, ষড়যন্ত্র এবং গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনা হয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু হয়েছে। অডিওটি মূল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হাসিনা ছাড়াও সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও পুলিশের ২০৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩ জন আটক আছেন। বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে, কিন্তু এখনো তা কার্যকর হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। বিশেষ করে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ৫২ জন নিহত হন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশি সহিংসতার অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। এই আন্দোলনের ফলে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।

আরও পড়ুন: শেখ হাসিনা-রেহানা-জয়সহ ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলার গেজেট প্রকাশ

আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, অডিওটি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের কোনো বেআইনি উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না এবং সিদ্ধান্তগুলো সদিচ্ছার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। তারা জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে বলা হয়েছে হাসিনার সরকারের পদক্ষেপগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

বিবিসির তদন্ত

বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, সহিংসতায় জড়িত ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে। বিবিসি আই ৩৬ দিনের বিক্ষোভ চলাকালে শত শত ভিডিও, ছবি ও নথি বিশ্লেষণ করেছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে নির্বিচারে গুলি চালায়, যার ফলে ৫২ জন নিহত হন। বিক্ষোভকারীরা পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে যাত্রাবাড়ী থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়, ফলে ৬ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ এখন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রয়েছে, যারা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামীলীগের অংশগ্রহনের অনুমতি দেওয়া হবে কিনে তা এখনও নিশ্চিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *