শেখ হাসিনা-hasina-newsedge4

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় ঘোষণার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে আনন্দের সঙ্গে কান্নার ঢেউ উঠেছে। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী হওয়ায় ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ের মুহূর্তে আদালত কক্ষে উল্লাসের মধ্যে কান্নার ঘনঘটা নেমে আসে, বিশেষ করে যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের।

শাহিনা বেগমের মতো অসংখ্য মা-বাবা এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার’ বলে উল্লেখ করেছেন। গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ চলাকালীন শাহিনার ২০ বছর বয়সী পুত্র সাজ্জাদ হোসেন পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পরে তার লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়। আল জাজিরার সঙ্গে কথায় শাহিনা বলেন, “এই রায় ১৭ কোটি মানুষের আবেগের ঢেউ তুলেছে। যতক্ষণ না তাকে (হাসিনাকে) ফিরিয়ে এনে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে, ততক্ষণ আমি শান্ত হতে পারছি না। আমার ছেলে থানার ভেতরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছে। কেউ তাকে বাঁচায়নি। যারা তাকে পুড়িয়ে মেরেছে, তারা যেন আর কোনো মায়ের সন্তানের ক্ষতি করতে না পারে।”

অভ্যুত্থানে প্রিয়জন হারানো শত শত পরিবার এই রায়কে ‘যুগান্তকারী’ বলে মনে করছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। প্রসিকিউটররা বলেন, হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টস কারখানার কাছে ৬ ছাত্রকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। যাদের ৫ জনকে গুলি করে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং একজনকে থানায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। আদালত বলেছে, ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে হাসিনার নির্দেশেই নিরাপত্তা বাহিনী এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

রায়ের পটভূমি

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ১৫ বছরের ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। পলাতক অবস্থায় ভারতে থাকায় অনুপস্থিতিতে কয়েক মাসের বিচারের পর এই রায় ঘোষণা করা হয়। আদালতের তিন সদস্যের প্যানেল (চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার, বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী) রায় ঘোষণা করেন। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ায় কম শাস্তি পান।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) রায়কে ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বাগত জানালেও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছে। মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন, “আমরা সব পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করি। বিচার দোষীর অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত ন্যায়বিচারের প্রয়োজন।” হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপত্তা খাত সংস্কারের সমন্বিত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল অগনেস ক্যালামার্ড বলেন, “এই রায় ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিচারের গতি ও অনুপস্থিতি নিয়ে ন্যায়বিচারের উদ্বেগ রয়েছে। সব দোষীকে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বিচার করতে হবে।”

ভারতের চ্যালেঞ্জ

রায়ের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে হাসিনা ও কামালকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের এক্সট্রাডিশন চুক্তি রয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক অপরাধে ফেরত দেওয়া যাবে না। ভারতের কূটনৈতিক চাপে এই রায় বিলম্বিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হাসিনার সহযোগী ভারত এখন কী করবে—ফেরত দেবে নাকি আশ্রয় দেবে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আরও পড়ুন: শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড, মামুনর ৫ বছর কারাদণ্ড

ভুক্তভোগীরা বলছেন, রায় যুগান্তকারী হলেও হাসিনা কি আসলেই বিচারের মুখোমুখি হবেন? শাহিনা বেগমের মতো অনেকেই বলছেন, “যতক্ষণ না তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা শান্ত হব না।” এই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক, কিন্তু বাস্তবায়নের পথ কতটা কঠিন, তা দেখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *