ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার মধুপুর গ্রাম সংলগ্ন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক গুলি করে এক বাংলাদেশি যুবককে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ওবায়দুল ইসলাম (২৩) মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের হানেফ আলীর ছেলে। ঘটনাটি রোববার (২৭ এপ্রিল) ভোরে ভারতের অংশে সংঘটিত হয়।
ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার মধ্যরাতে ৭-৮ জনের একটি দল ভারতে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে বিএসএফ তাদের ঘেরাও করে। এ সময় বেশিরভাগ সদস্য পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও ওবায়দুল ইসলাম ও মোহাম্মদ মিকাইল (২২) আটকা পড়েন। কিছুক্ষণ পর সীমান্ত এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায়। সকালে ভারতীয় অংশে ওবায়দুলের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। অন্যদিকে, মিকাইল বেলা ১২টার দিকে বাড়ি ফিরেছেন।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. রফিকুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, “সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিএসএফের ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার ফোন করে একটি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে মরদেহটি বাংলাদেশির কিনা, তা তারা নিশ্চিত করেনি। মরদেহটি ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাগদা থানায় রাখা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, মরদেহের পরিচয় নিয়ে কারও বক্তব্য থাকলে বিএসএফ বা বাগদা থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, গত ১০ বছরে (২০১৫-২০২৪) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৩০৫ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৮২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ২০২০ সালে (৫১ জন নিহত, ২৫ জন আহত), ২০১৫ সালে (৪৩ জন নিহত, ৫৪ জন আহত) এবং ২০১৯ সালে (৪২ জন নিহত, ২৫ জন আহত)। ২০২৪ সালে ২৬ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছেন।
বিএসএফের বিতর্কিত নীতি
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিতর্কিত “শুট অন সাইট” নীতির জন্য সমালোচিত। এই নীতির আওতায় বিএসএফ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কারণ ছাড়াই গুলি করতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, নিহতদের বেশিরভাগই গরু ব্যবসায়ী বা সীমান্তবর্তী কৃষক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় ১,০০০ বাংলাদেশি নাগরিক বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের কোনোটির জন্যই বিএসএফ সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। মরদেহটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিএসএফের সঙ্গে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে আলোচনা করা হবে। তবে, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিয়মিত ঘটছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। একটি পোস্টে বলা হয়, “পাকিস্তান সীমান্তে মার খেয়ে বাংলাদেশিদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে বিএসএফ।” মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় আইনে সীমান্তে প্রবেশ বা পাচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই, এবং বিএসএফের সাজা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তারা সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করতে পারত।
বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে একাধিকবার কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএসএফের এই ধরনের কার্যকলাপকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছিল।

































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































