শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণা বিএনপির

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ পরবর্তী প্রথম সংসদীয় সভায় দলটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তাদের কোনো এমপি শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা ভোগ করবেন না এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আবাসিক প্লট গ্রহণ করবেন না। রাজনৈতিক বিলাসিতা ত্যাগ করে জনগণের পাশে থাকার এই ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংসদীয় দলের প্রথম সভা: ত্যাগের নতুন অঙ্গীকার

মঙ্গলবার সকালে শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে শপথ নেন বিএনপির ২০৯ জন নবনির্বাচিত এমপি। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষেই সংসদীয় দলের সভা কক্ষে দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন দলটির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে (ভার্চুয়ালি) অনুষ্ঠিত এই সভায় সর্বসম্মতভাবে বিলাসদ্রব্য ও সরকারি জমি বর্জনের এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা জনগণের আমানত নিয়ে সংসদে এসেছি। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের মানুষ চরম অর্থকষ্ট এবং বৈষম্যের শিকার হয়েছে। এমতাবস্থায় জনগণের ট্যাক্সের টাকায় শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি চড়া বা সরকারি প্লট দখল করা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন সংস্কৃতি চালু করতে চাই।”

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকে সংসদ সদস্যদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি ও রাজউকের প্লট বরাদ্দের যে প্রথা চলে আসছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হতো। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আমূল পরিবর্তনের। বিএনপির এই সিদ্ধান্ত সেই গণ-আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

সভায় উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, শুধু গাড়ি বা প্লট নয়, সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ মিতব্যয়িতা বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলটি মনে করে, রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার নেতৃত্ব দিতে হবে জনপ্রতিনিধিদেরই—ত্যাগের মাধ্যমে।

এই ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাধারণ নাগরিকদের মতে, যদি এই সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের ‘ভিআইপি কালচার’ থেকে বেরিয়ে এসে জনপ্রতিনিধিরা যখন সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়ান, তখনই গণতন্ত্র প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়।

বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখন বিএনপির এই ঘোষণা বিরোধী দল ও অন্যান্য শরিকদের ওপরও এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *