২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান, যা ‘মনসুন বিপ্লব’ নামে পরিচিত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। এই অভ্যুত্থানে ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান, এবং ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবন, দুর্নীতি দমন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার নিয়ে কাজ শুরু করে। তবে, ১১ মাস পরও দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈদেশিক সম্পর্কের জটিলতার মুখোমুখি।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ কারণ দেখিয়ে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করে। এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনীর মাধ্যমে আরোপ করা হয়, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগঠন হিসেবে বিচারের আওতায় আনার ক্ষমতা দেয়। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের প্রাচীনতম এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী দলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়, যা অনেকের মতে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ওপর হুমকি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই নিষেধাজ্ঞাকে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃত’ দমনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন নীতির প্রতিচ্ছায়া।
জরিপে দেখা গেছে, ১৪% ভোটার এখনও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল, এবং দলটির নেতা মোহাম্মদ আরাফাত দাবি করেন, দেশের অর্ধেক জনগণ তাদের সমর্থন করে। তবে, আওয়ামী লীগের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পুলিশি হেফাজতে তাদের ২৪ জন নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ড. ইউনূস ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে তিনি ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি নীতিমালার ওপর রাজনৈতিক ঐকমত্য চান, যা নির্বাচনের মূলনীতি ও সংস্কারের তালিকা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের জন্য চাপ দিচ্ছে, যখন জামায়াত-ই-ইসলামি এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার শর্তে এপ্রিলের সময়সূচি সমর্থন করে। এই ভিন্নমত রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
জরিপে দেখা গেছে, বিএনপি ৪২% এবং জামায়াত-ই-ইসলামি ৩২% ভোটার সমর্থন পাচ্ছে, যখন এনসিপি মাত্র ৫% সমর্থন পাচ্ছে। উদারপন্থীরা জামায়াত-ই-ইসলামির উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ এটি ধর্মীয় উগ্রবাদকে উৎসাহিত করতে পারে। বিএনপির প্রতিও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যা জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের লক্ষ্য করে দমনমূলক পদক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ১,৬৭৬টি গুমের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০০ জনের সন্ধান এখনও অজানা। তবে, নতুন সরকারের প্রস্তাবিত গুম সংক্রান্ত আইন এই ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে সমালোচনা উঠেছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আইনবিদ আখতার খান বলেন, টেকসই পরিবর্তনের জন্য সকল পক্ষের ঐক্য প্রয়োজন, শাস্তির মাধ্যমে নয়। তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘নেলসন ম্যান্ডেলা মুহূর্তের’ প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিকভাবে, বাংলাদেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.২% থেকে কমে ৩.৯% হলেও, এটি গত বছরের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ১২% থেকে ৯% এ নেমে আসা উল্লেখযোগ্য। সরকার ব্যাংক খাতের অপরিশোধিত ঋণ পরিশোধ এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে, যার ফলে আইএমএফ এবং এডিবি থেকে বহু বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদিত হয়েছে। তবে, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব এখনও চ্যালেঞ্জ। মার্কিন শুল্ক (৩৭%) এবং বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত ছিল বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে, হাসিনার ভারতে আশ্রয় এবং ইউনূস সরকারের চীনমুখী নীতি সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভারত একটি ট্রান্স-শিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে, যা বাংলাদেশি রপ্তানি ব্যয় বাড়িয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১১% বাংলাদেশি ভারতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, যখন ৭৫% চীনের প্রতি ইতিবাচক।
ড. ইউনূসের চীন সফর এবং জে-১০সি ও জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য পরিকল্পনা বাংলাদেশের নতুন বৈদেশিক নীতির ইঙ্গিত দেয়। চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ত্রিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলন ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তবে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা কমিয়েছে।
বাংলাদেশে নির্বাচনের জন্য নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ১৫০ ছুঁয়েছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) গণঅভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত একটি নতুন শক্তি, তবে এর সমর্থন সীমিত। বিএনপি এবং জামায়াত-ই-ইসলামির প্রভাব বেশি, তবে উভয় দলের প্রতি দুর্নীতি ও উগ্রবাদের অভিযোগ রয়েছে।
ড. ইউনূসের সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব এবং আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে জটিল করছে। সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চাপে ইউনূস ২০২৫ সালের মে মাসে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছিলেন, যদিও তিনি এখনও দায়িত্বে রয়েছেন।
বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার কিছু অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখালেও, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং জটিল বৈদেশিক সম্পর্ক দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করছে। নির্বাচনের সময়সূচি এবং ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তবে রাজনৈতিক বিভেদ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এই পথকে কঠিন করে তুলেছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, রয়টার্স, ফরেন পলিসি, কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস






































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































