দুর্নীতি: ২০২৫ সিপিআই-তে ১৩তম স্থান, স্কোর বাড়লেও র‍্যাঙ্কিংয়ে পতন!

রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে মঙ্গলবার সকালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫ প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশ ১৮২টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৩তম স্থানে উঠে এসেছে, যা গত বছরের ১৪তম স্থান থেকে এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া। স্কোর ১০০-এর স্কেলে ২৪ পেয়েছে, যা বৈশ্বিক গড় ৪২-এর চেয়ে অনেক কম। এই খবর দেশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে সূচকের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় স্কোর ১ পয়েন্ট বেড়েছে, কিন্তু সামগ্রিক র‍্যাঙ্কিংয়ে পতন ঘটেছে কারণ অন্যান্য দেশের অবস্থান উন্নত হয়েছে। সিপিআই হলো ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) বার্ষিক প্রতিবেদন, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণা মাপে। এটি বিশেষজ্ঞদের জরিপ, ব্যবসায়ীদের মতামত এবং অন্যান্য সূচকের ভিত্তিতে তৈরি হয়। ০ থেকে ১০০-এর স্কেলে উচ্চ স্কোর মানে কম দুর্নীতি, আর নিম্ন স্কোর মানে বেশি দুর্নীতি।

বাংলাদেশের এই অবস্থান দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি এই অগ্রগতিকে ছায়া ফেলছে। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, ভূমি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বড় বড় প্রকল্পে অনিয়ম, ঘুষ এবং নেপোটিজমের অভিযোগ প্রায়শই উঠে আসে। এছাড়া, মহামারী পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে দুর্নীতি আরও প্রকট হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ অঞ্চলে ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর স্কোর বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের স্কোর প্রায় ৪০-এর কাছাকাছি, যা বাংলাদেশের ২৪-এর চেয়ে অনেক উন্নত। আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দুর্নীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং দুর্নীতিবিরোধী আইনের অপ্রয়োগ এর মূল কারণ।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, সিপিআই ২০২৫-এ সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ হিসেবে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো শীর্ষে রয়েছে, যাদের স্কোর ৯০-এর উপরে। অন্যদিকে, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং সিরিয়ার মতো দেশগুলো সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশের স্কোর ৫০-এর নিচে, যা দুর্নীতির বৈশ্বিক ছড়িয়ে পড়া নির্দেশ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, স্কোরের সামান্য উন্নতি সত্ত্বেও র‍্যাঙ্কিংয়ের পতন অন্যান্য দেশের দ্রুত অগ্রগতির ফল।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, এটি সমাজের আস্থা নষ্ট করে এবং অসমতা বাড়ায়। বাংলাদেশকে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দুর্নীতিবিরোধী কমিশনকে শক্তিশালী করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি দেখাতে হবে।” তাঁর মতে, নির্বাচনী সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্নীতির এই চিত্র দেশের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছতার অভাবে পিছিয়ে যান, যা কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দুর্নীতি জিডিপির ২-৩ শতাংশ ক্ষতি করে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।

মূল তথ্যসমূহ:

– বাংলাদেশের সিপিআই স্কোর: ২৪ (১০০-এর মধ্যে), গত বছরের চেয়ে ১ পয়েন্ট বেশি।
– র‍্যাঙ্কিং: সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৩তম, গত বছর ১৪তম ছিল।
– বৈশ্বিক গড় স্কোর: ৪২, বাংলাদেশের চেয়ে ১৮ পয়েন্ট বেশি।
– দেশের সংখ্যা: ১৮২টি।
– দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান: দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, আফগানিস্তানের পরে।

এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দুর্নীতি মোকাবিলায় যদি সরকার এবং নাগরিক সমাজ একযোগে কাজ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। আশা করা যায়, এই সূচক সংস্কারের পথ দেখাবে এবং দেশকে আরও স্বচ্ছ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *