আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-newsedge24

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের আওতায় ২৪ ঘণ্টার পর কোনো ব্যক্তির আটকের তথ্য গোপন করা, আটকের স্থান সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত না করা কিংবা তাকে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা গুমের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নতুন আইনটি দেশে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। নতুন আইনে গুমের একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই সময়ের পরও যদি ওই ব্যক্তির আটকের বিষয়টি গোপন রাখা হয়, আটকের স্থান জানানো না হয়, তাকে আইনগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় বা তার স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টা পর থেকে যে সময় পর্যন্ত এসব করা হবে, সেটি গুমের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য গুমের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার পাশাপাশি সহযোগিতা বা প্ররোচনায় যুক্ত থাকলেও আইনের আওতায় আসবেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো পর্যালোচনা হবে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এতদিন গুমের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট আইন না থাকায় ট্রাইব্যুনালের সামনে থাকা অভিযোগগুলো নতুন আইনের আলোকে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে। যেসব গুমের ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হিসেবে প্রমাণিত হবে, সেগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় আসবে। আর যেসব ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত অপরাধের মধ্যে পড়বে না, সেগুলো স্বতন্ত্র গুমের অপরাধ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হবে। আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর সেগুলো আমরা নতুন আইনের পরিপ্রেক্ষিতে পর্যালোচনা করব। এরপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, জরিমানা ও ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকলেও এসব আদেশ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রুলস অব প্রসিডিউরে বিস্তারিত প্রক্রিয়া স্পষ্ট নয় বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা জরিমানা আদায়ের বিভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। ভবিষ্যতে ট্রাইব্যুনালের রায়ে এসব প্রচলিত আইন অনুসরণের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে সরকারের পক্ষে রায় বাস্তবায়ন সহজ হবে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের রুলস অব প্রসিডিউর সংশোধন করে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দুই ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সমন্বয়ে একটি সেমিনার বা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

পলাতক আসামি মাওলানা আবুল কালাম আজাদের আপিলের সুযোগ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারায় রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা না হলে পরবর্তীতে সেই আপিল গ্রহণযোগ্য হবে না। সেটা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেই হোক বা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ক্ষেত্রেই হোক—আইন সবার জন্য একই। কোনো পলাতক আসামি ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করলে পরবর্তীতে তার আপিল করার সুযোগ নেই। রায়ের পর ৩০ দিন অতিক্রান্ত হলে তা বাস্তবায়ন করা ছাড়া আর কোনো আইনগত পথ থাকে না।

আবুল কালাম আজাদকে আত্মসমর্পণের পর আপিল করার সুযোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাজা স্থগিত বা কমানোর ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তবে ৩০ দিনের পর আপিলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের নির্বাহী আদেশ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারাকে অতিক্রম করার সুযোগ নেই। তাই আত্মসমর্পণের শর্ত হিসেবে আপিলের সুযোগ দেওয়ার অংশটি আইনসঙ্গত নয়। এ কারণেই ট্রাইব্যুনাল ওই আদেশের ভিত্তিতে আবুল কালাম আজাদের আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেনি। তবে সাজা স্থগিত করার বিষয়ে সরকারের এখতিয়ার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মামলা অন্য আদালতে পাঠানোর ক্ষমতা চিফ প্রসিকিউটরের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রুলস অব প্রসিডিউর, ২০১০-এর ২০২৫ সালের সংশোধনী অনুযায়ী কোনো মামলা যেকোনো পর্যায়ে তদন্তাধীন থাকলে চিফ প্রসিকিউটর তদন্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অন্য কোনো সংস্থা কোনো মামলা তদন্ত করলে সেটিও প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আবার ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত কোনো অপরাধের বিচার অন্য কোথাও চললে সেটি ট্রাইব্যুনালে আনার জন্য চিফ প্রসিকিউটর আবেদন করতে পারেন। এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আবেদন করার সুযোগ নেই। এ ধরনের আবেদন রিডানড্যান্ট এবং গ্রহণযোগ্য নয়। আইন অনুযায়ী এ ধরনের আবেদন করার ক্ষমতা চিফ প্রসিকিউটরের।

আরও পড়ুন: বিজিবিকে সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। অনেক প্রভাবশালী আসামির রায় সামনে রয়েছে। রায়ের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ তত বাড়ছে।

কারাগার থেকে আসামিদের ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, আদালতে আনার পরও পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসামিদের আদালতে হাজির এবং পরে কারাগারে ফেরত পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *